বাঘ ইকো-ট্যাক্সি
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ট্রাফিক জ্যাম দূর করার জন্য ‘বাঘ ইকো মোটরস লিমিটেড’ তৈরি করেছে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক থ্রি হুইলার (তিন চাকার বাহন) ‘বাঘ’।
দেশে প্রথমবারের মতো চালু হতে যাচ্ছে পরিবেশবান্ধব ইলেক্ট্রিক ট্যাক্সি। কোনো ধরনের জ্বালানি ছাড়া সম্পূর্ণ সৌরবিদ্যুতে চলবে এটি। ড্রাইভার ছাড়া ৩ জনের ধারনক্ষমতার এই বাহনে টেলিভিশন এবং ওয়াইফাইর ব্যবস্থা রয়েছে। যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে অ্যাপসে ভাড়া নির্ধারণ হবে। রোববার এর অনুমোদন হয়েছে। ময়মনসিংহের একজন উদ্যোক্তা দেশেই তৈরি করছেন এ গাড়ি। শিগগিরই এটি রাস্তায় দেখা যাবে। ।
এ বছরের ১৯ জানুয়ারিতে তারা কারখানার অনুমোদনও পেয়েছে। নিজস্ব প্রযুক্তি ব্যবহার করে এটিকে পরিবেশবান্ধব করতে সংযুক্ত করা হয়েছে ইলেকট্রিক উপায়ে চার্জিং সুবিধাসংবলিত লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি। কারণ, এসিডনির্ভর যানবাহনগুলোর ব্যাটারি সঠিকভাবে পুনর্ব্যবহারযোগ্য না করায় সেসব থেকে সৃষ্টি হয় মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি।
এতে আছে দ্রুত চার্জিং সুবিধাসংবলিত বিশেষ চার্জিং পোর্ট, যা দ্বারা একবারে সম্পূর্ণ চার্জে ৯০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে পারে ‘বাঘ’। তাদের ইকো ট্যাক্সিতে ২৮০ ওয়াটের সৌরবিদ্যুতের প্যানেল ব্যবহার করা হয়েছে, যার দ্বারা দিনের বেলায় ৩০ শতাংশ ব্যাটারির চার্জ সংরক্ষণ করা যাবে এবং ৪০ কিলোমিটার শুধু এই সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করেই চলাচল করা যাবে। প্রত্যেকবার ‘বাঘ’কে সম্পূর্ণ চার্জ করার জন্য খরচ পড়বে ৬০-৭০ টাকা। এই ইকো ট্যাক্সি পাওয়া যাবে চারটি রঙে—সবুজ, লাল, নীল ও হলুদ। একজন চালক ও ছয়জন যাত্রী পরিবহন করা যানটি সর্বোচ্চ ৬৫০ কেজি ওজন বহন করতে পারবে। রয়েছে এবিএস ব্রেকিং সিস্টেম। ফলে ট্যাক্সিটি তিন ফুটের মধ্যে দাঁড়িয়ে যাবে। যানটি চলবে সর্বোচ্চ ৪৫ কিলোমিটার গতিতে। রয়েছে দুই বছরের ওয়ারেন্টি। দাম পড়বে আনুমানিক সর্বোচ্চ চার থেকে ছয় লাখ টাকা। এই যানটি প্রতি কিলোমিটার চলতে খরচ হবে ৭৫ পয়সা।
বাহনটির ডিজাইন অ্যারো ডায়নামিক। সাধারণত একটি সিএনজির চাকার সাইজ ৮। আর বাঘ ইকো-ট্যাক্সির চাকার সাইজ ১২। ফলে গ্রামগঞ্জে রাস্তার গর্তে পড়লে এটির কোনো সমস্যা হবে না। যানটি বর্তমানে বিআরটিএতে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
মিলবে যাত্রীর নিরাপত্তা
যাত্রীর নিরাপত্তার জন্য বাঘ ইকো-ট্যাক্সিতে রয়েছে সিকিউরিটি ক্যামেরা। প্রতিষ্ঠানটির কেন্দ্রীয় অফিস থেকে এই ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ করা হবে। ট্যাক্সির ছাদে একটি নাইট ভিশন ক্যামেরা এবং পেছনে একটি সাধারণ ক্যামেরাও থাকছে। চাইলে বাংলাদেশ পুলিশও এই ক্যামেরা ব্যবহার করতে পারবে। কোনো ঘটনার সঠিক তথ্য পেতে এটি ব্যবহার করা যাবে। ক্লাউডভিত্তিক সফটওয়্যার দ্বারা তথ্যের সুরক্ষা করা হবে। ডিজিটাল মনিটরিং সুবিধা, অপ্রীতিকর গতিবিধিসহ পথে কোনো প্রকার দুর্ঘটনার সম্মুখীন হলে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে বাঘ কর্তৃপক্ষ। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনার সৃষ্টি হলে প্রয়োজনে ট্যাক্সির পাওয়ারও বন্ধ করে দিতে পারবে কর্তৃপক্ষ।
পরিবেশবান্ধব পাওয়ার সিস্টেম
যানটিতে সংযুক্ত করা হয়েছে লিথিয়াম আয়ন ব্যটারি, যা পরিবেশবান্ধব। এতে আরএফআইডি-সংবলিত ব্যাটারি এবং পাওয়ার সেভিং মোড থাকায় এতে অতিরিক্ত সুবিধাও পাওয়া যাবে। যানটির ব্যাটারি ও চার্জারে সিম কার্ড ব্যবহার করা হয়েছে। ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ও চার্জিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমের ব্যাটারির চার্জ মনিটরিং করা হবে। ফলে অবৈধ সংযোগের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে চার্জ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সফটওয়্যারের মাধ্যমে মনিটরিং করা হবে ব্যাটারির স্বাস্থ্য। বাঘ ইকো মোটরস লিমিটেডের প্রেসিডেন্ট কাজী জসিমুল ইসলাম বাপ্পী বলেন, ‘আমাদের বৈদ্যুতিক যান উচ্চশক্তি দক্ষতাসম্পন্ন এবং শতকরা ৫০ ভাগ খরচ সাশ্রয়ী। চার্জিং স্টেশন এবং প্রত্যক্ষ সমাধান স্থাপনের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে পারব যে বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে না এবং এতে সরকারের আরো বেশি বিদ্যুৎও সাশ্রয় হবে। আমাদের পরিবহনব্যবস্থা হবে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড। ’
থাকছে অত্যাধুনিক সব সুযোগ-সুবিধাও
ডিজিটাল ইকো ট্যাক্সিটিতে রয়েছে আধুনিক নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা। ফলে যাত্রী ও গাড়িচালক উভয়ে সেসব ফিচার ব্যবহার করতে পারবেন। ট্যাক্সিটিতে রয়েছে নন-স্টপ ওয়াই-ফাই সুবিধা। আরো আছে বিনোদন ট্যাব ও প্যানিক বাটন। ধরুন কোনো যাত্রী যদি মনে করেন তিনি কোনো প্রকার বিপদে পড়তে যাচ্ছেন, তখন তিনি গাড়িতে থাকা প্যানিক বাটনটি ব্যবহার করতে পারবেন। এই বাটন চাপলে যানটির গতি পাঁচ কিলোমিটারে নেমে আসবে। চাইলেও যানটির গতি আর বৃদ্ধি করা যাবে না। এর মধ্যে কর্তৃপক্ষের কাছে চলে যাবে বার্তা। যাত্রী চাইলে অত্যাধুনিক পস মেশিন দিয়েও ভাড়া প্রদান করতে পারবেন। এটিএম কার্ড ছাড়াও ব্যবহার করা যাবে যেকোনো মোবাইল ব্যাংকিং সেবাও। তাপমাত্রা দূরীকরণের জন্য ফ্যান এবং ভেতরের তাপ বের হওয়ার জন্য রয়েছে ভেন্টিলেশন সুবিধা। ট্রাফিক জ্যামে আটকা পড়লে পাবেন মোবাইল চার্জের সুবিধা। রয়েছে বিশুদ্ধ পানি এবং ফায়ার সেফটি সুবিধাও। চালকের জন্য রয়েছে আইডি কার্ড ও ড্রেস কোড। এ ছাড়া অ্যাপ ও ক্লাউডভিত্তিক সেবা প্রদান করা হবে ট্যাক্সিটিতে। অ্যাপ ও ডাটা সফটওয়্যারও নিজেদের তৈরি। যানটি ব্যবহারের মাধ্যমে জোনভিত্তিক যানজট নিরসনের আশা ব্যক্ত করছেন এটির উদ্যোক্তারা।
পরিবেশবান্ধব কারখানা
গাজীপুরের হোতাপাড়ায় নিজস্ব কারখানা তৈরি করেছে বাঘ ইকো মোটরস লিমিটেড। এরই মধ্যে কারখানাটি সরকার অনুমোদনও দিয়েছে। কারখানাটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাইলে কাজী জসিমুল ইসলাম বাপ্পী বলেন, ‘২০২৩ সালের মধ্যে ৪০ টন পণ্য নিয়ে চলতে পারে এমন ট্রাক তৈরি করা। আমরা আশাবাদী ২০২৩ সালে ৫ থেকে ৪০ টন পর্যন্ত ইলেকট্রিক ট্রাকগুলো বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করবে। ’
Leave a Reply