ইসলাম ধর্মে খেজুরকে অন্যান্য সব ফল থেকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। কোরআন শরিফে খেজুরের কথা বলা হয়েছে। সুরা মরিয়মে এর উপকারিতার কথাও বর্ণনা করা হয়েছে। খেজুর এক ধরনের তালজাতীয় শাখাবিহীন বৃক্ষ। এর বৈজ্ঞানিক নাম ফিনিক্স ড্যাকটিলিফেরা। এ গাছটি প্রধানত মরু এলাকায় ভালো জন্মে। এই ফলটি অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণে ভরপুর বলে বেশিরভাগ মানুষ এটি খেতে পছন্দ করেন। শুধু পুষ্টিগুণ কেন, অসাধারণ ঔষধি গুণসম্পন্নও এই ফলটি। বিস্তারিত লিখেছেন লায়লা আরজুমান্দ
ইতিহাস খেজুরকে আরবিতে ‘তুমুর বা তামুর বা তামারুন’ বলে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে সুমিষ্ট ও পুষ্টিকর ফল হিসেবে চিহ্নিত করা হয় একে। খেজুরের চাষ ঠিক কবে শুরু হয়েছিল বা ঠিক কোনো জায়গায় এর প্রথম চাষ হয়, সেই বিষয়ে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সেই বিষয়ে নানা জনের নানা মত রয়েছে। আরবের পূর্বাঞ্চলে খৃস্টপূর্ব ৫৫৩০ থেকে ৫৩২০ পর্যন্ত খেজুর চাষের প্রতত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ রয়েছে। বর্তমান ইরাকের আশপাশে এর চাষ শুরু হয় বলে ধারণা করা হয়। পরে প্রাচীনকালে মেসোপটেমিয়া থেকে প্রাগৈতিহাসিক মিসর পর্যন্ত এর চাষাবাদ চলে। প্রাগৈতিহাসিক মিসরীয়রা খেজুর থেকে মদ তৈরি করত। আরও পরে এসে বণিকদের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনে খেজুরের প্রচলন হয়।
খেজুরের সংক্ষিপ্ত পরিচিতিঃ
খেজুর (সংস্কৃত: खर्जूरम्); (ইংরেজি: Date Palm) এক ধরনের তালজাতীয় শাখাবিহীন বৃক্ষ। এর বৈজ্ঞানিক নাম ফিনিক্স ড্যাকটিলিফেরা (Phoenix dactylifera)। মানব সভ্যতার ইতিহাসে সুমিষ্ট ফল হিসেবে এর গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ায় অনেক বছর পূর্ব থেকেই এর চাষাবাদ হয়ে আসছে। এ গাছটি প্রধানতঃ মরু এলাকায় ভাল জন্মে। খেজুর গাছের ফলকে খেজুররূপে আখ্যায়িত করা হয়। মাঝারি আকারের গাছ হিসেবে খেজুর গাছের উচ্চতা গড়পড়তা ১৫ মিটার থেকে ২৫ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর লম্বা পাতা রয়েছে যা পাখির পালকের আকৃতিবিশিষ্ট। দৈর্ঘ্যে পাতাগুলো ৩ থেকে ৫ মিটার পর্যন্ত হয়। পাতায় দৃশ্যমান পত্রদণ্ড রয়েছে। এক বা একাধিক বৃক্ষ কাণ্ড রয়েছে যা একটিমাত্র শাখা থেকে এসেছে। সূত্রঃ উইকিপিডিয়া।
খেজুরের পুষ্টিগুণ
অনেকেই মনে করেন শুকনো খেজুর থেকে ফ্রেশ ফলে বেশি পরিমাণ পুষ্টি থাকে। তবে এটা একদমই ভুল ধারণা। বরং শুকনো খেজুরে আরও বেশি পরিমাণে ক্যালোরি থাকে। খেজুরের বেশির ভাগ ক্যালোরিই আসে কার্বোহাইড্রেট থেকে। প্রতি ১০০ গ্রাম খেজুরে রয়েছে ক্যালোরি ২৭৭, কার্বোহাইড্রেট ৭৫ গ্রাম, ফাইবার বা আঁশ ৭ গ্রাম, প্রোটিন ২ গ্রাম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, কপার, ম্যাঙ্গানিজ, আয়রন, ভিটামিন বি-৬সহ অন্যান্য পুষ্টি উপাদান। তা ছাড়া খেজুরে আছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট যা কিনা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
খেজুরের সুস্বাদু আর বেশ পরিচিত একটি ফল, যা ফ্রুকটোজ ও গ্লাইসেমিক সমৃদ্ধ। এটি রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়ায়। খেজুর ফলকে চিনির বিকল্প হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। খেজুরের পুষ্টি উপাদান সম্পর্কে বলা হয় চারটি বা ৩০ গ্রাম পরিমাণ খেজুরে আছে ৯০ ক্যালোরি, এক গ্রাম প্রোটিন, ১৩ মিলি গ্রাম ক্যালসিয়াম, ২.৮ গ্রাম ফাইবার এবং আরও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান। খেজুর শক্তির একটি ভালো উৎস। তাই খেজুর খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শরীরের ক্লান্তিভাব দূর হয়। আছে প্রচুর ভিটামিন বি, যা ভিটামিন বিসিক্স মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক।
উপকারিতা
পুষ্টিকর এই ফলকে প্রাকৃতিক শক্তির উৎসও বলা হয়ে থাকে। কারণ কয়েকটি ফল খেলে যে পরিমাণ এনার্জি পাওয়া যায় তা অন্য কোনো ফল থেকে পাওয়া যায় না। অসাধারণ পুষ্টিগুণে ভরপুর শারীরিক সমস্যা দূর করতে অনেক কার্যকর।
রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায় : শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে ও সুস্বাস্থ্যের জন্য খুব দরকারি অ্যান্টি অক্সিডেন্ট। অ্যান্টি অক্সিডেন্ট তারুণ্য ধরে রাখে, ক্লান্তি দূর করে, স্মৃতিশক্তি ভালো রাখতে, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ প্রতিহত করতে সাহায্য করে।
মস্তিষ্ক সচল রাখে : খেজুরের সবচেয়ে বড় গুণ হলো খেজুর মস্তিষ্ককে সচল ও প্রাণবন্ত রাখে। স্মৃতিশক্তি বাড়ায়। সেই সঙ্গে মস্তিষ্কের ক্ষমতাও বাড়ায়। বিশেষ করে বয়স্কদের জন্য খুবই উপকারী এটি।
পরিপাকে সাহায্য করে : খেজুরে রয়েছে এমন পুষ্টি উপাদান যা খাদ্য পরিপাকে সাহায্য করে। তা ছাড়া এতে থাকা ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য রোধে সহায়তা করে। কখনো কখনো ডায়রিয়ার জন্যও এটা অনেক উপকারী।
ক্যানসার প্রতিরোধ : গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত খেজুর খেলে পেটের ক্যানসারের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসে। এ ছাড়া যকৃতের সংক্রমণেও খেজুর উপকারী।
ওজন কমায় : যেহেতু খেজুর খেলে দীর্ঘ সময় আর ক্ষুধা লাগে না, তাই খাওয়াও হয় কম। তবে খাওয়া কম হলেও পুষ্টির ঘাটতি কিন্তু হয় না। কারণ মাত্র কয়েকটি খেজুর শরীরের প্রয়োজনীয় শর্করার ঘাটতি পূরণ করে দেয়।
হাড় মজবুত হয় : খেজুরে রয়েছে প্রচুর ক্যালসিয়াম, যা কিনা হাড় গঠনে সহায়ক। ফলে খেজুর হাড় মজবুত, শিশুদের দাঁতের মাড়ি শক্ত করতেও সাহায্য করে।
গর্ভাবস্থায় দরকারি : গর্ভাবস্থায় খেজুর খাওয়া খুবই উপকারী। নিজের ও অনাগত সন্তানের পুষ্টির বিষয়টি এ সময় খুবই দরকারি। এটা দুর্বলতা কাটাতে সাহায্য করে। এগুলো ছাড়াও খেজুরের রয়েছে আরও অনেক উপকারিতা। যেমন, হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে, যৌনক্ষমতা বাড়াতে, উচ্চ রক্তচাপ কমাতে, মায়ের বুকের দুধ বাড়াতেও খেজুর খাওয়া হয়।
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন খেজুরঃ
আয়রনে ভরপুর খেজুর খেতে পারেন প্রতিদিন। অন্তত দুটি খেজুর যদি প্রতিদিন খান তবে অনেক রোগ কাছেও ঘেঁষবে না। পুষ্টিবিদদের মতে, শরীরের প্রয়োজনীয় আয়রনের সবই রয়েছে খেজুরে।
আসুন জেনে নিই, খেজুরের আরও কিছু উপকারিতা-
প্রতিরোধের ক্ষমতা বাড়াতেঃ খেজুরে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন, খনিজ, ক্যালসিয়াম ও পটাশিয়া। খেজুরে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরে রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা বাড়ায়।
রক্তচাপ কমাতেঃ প্রতিটি খেজুরে রয়েছে ২০ থেকে ২৫ মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম, যা উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে।
রক্তস্বল্পতায়ঃ রক্তস্বল্পতায় ভোগা রোগীরা প্রতিদিন খেজুর খেতে পারেন। একজন সুস্থ মানুষের শরীরে যতটুকু আয়রন প্রয়োজন, তার প্রায় ১১ ভাগ পূরণ করে খেজুর।
কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায়ঃ কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় রাতে পানিতে খেজুর ভিজিয়ে রাখুন। পর দিন সকালে খেজুর ভেজানো পানি পান করুন। দূর হবে কোষ্ঠকাঠিন্য। এছাড়া খেজুরে আছে এমন সব পুষ্টিগুণ যা খাদ্য পরিপাকে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য রোধ করে। কখনও কখনও ডায়রিয়ার জন্যেও এটা অনেক উপকারী।
হৃদস্পন্দনের হার ঠিক রাখতেঃ খেজুরে থাকা নানা খনিজ হৃদস্পন্দনের হার ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
রেটিনা ভালো রাখতেঃ খেজুরে লিউটেন ও জিক্সাথিন থাকায় তা রেটিনা ভালো রাখে।
ক্যানসার প্রতিরোধেঃ খেজুর পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এবং প্রাকৃতিক আঁশে পূর্ণ। এক গবেষণায় দেখা যায়, খেজুর পেটের ক্যানসার প্রতিরোধ করে। আর যারা নিয়মিত খেজুর খান তাদের বেলায় ক্যানসারে ঝুঁকিটাও কম থাকে। খুব সম্প্রতি একটি গবেষণায় উঠে এসেছে যে খেজুর Abdominal ক্যান্সার রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে এবং অবাক করা বিষয় হচ্ছে এটি অনেক সময় ওষুধের চেয়েও ভাল কাজ করে।
ওজন হ্রাস করতেঃ মাত্র কয়েকটা খেজুর কমিয়ে দেয় ক্ষুধার জ্বালা। এবং পাকস্থলীকে কম খাবার গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে। এই কয়েকটা খেজুরই কিন্তু শরীরের প্রয়োজনীয় শর্করার ঘাটতি পূরণ করে দেয়।
সংক্রমণ ঠেকাতেঃ যকৃতের সংক্রমণে খেজুর উপকারী। এছাড়া গলা ব্যথা, বিভিন্ন ধরনের জ্বর, সর্দি, এবং ঠাণ্ডায় খেজুর উপকারী। খেজুর অ্যালকোহল জনিত বিষক্রিয়ায় বেশ উপকারী। ভেজানো খেজুর খেলে বিষক্রিয়ায় দ্রুত কাজ করে।
রক্তশূন্যতা প্রতিরোধেঃ প্রচুর মিনারেল সঙ্গে আয়রন থাকার কারণে খেজুর রক্তশূন্যতা রোধ করে। তাই যাদের হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কম তারা নিয়মিত খেজুর খেয়ে দেখতে পারেন।
কর্মশক্তি বাড়ায়ঃ খেজুরে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক চিনি থাকার কারণে খেজুর খুব দ্রুত শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। সারাদিন রোজা রাখার পর রোজাদাররা যদি মাত্র ২টি খেজুর খান তবে খুব দ্রুত কেটে যাবে তাদের ক্লান্তি।
স্নায়ুতন্ত্রের কর্মক্ষমতা বাড়ায়ঃ খেজুর নানা ভিটামিনে পরিপূর্ণ থাকার কারণে এটি মস্তিষ্কের চিন্তাভাবনার গতি বৃদ্ধি রাখে, সঙ্গে স্নায়ুতন্ত্রের কর্মক্ষমতা বাড়ায়। একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ছাত্র-ছাত্রী যারা নিয়মিত খেজুর খায় তাদের দক্ষতা অন্যদের তুলনায় ভাল থাকে।
হৃদরোগ প্রতিরোধেঃ খেজুরে রয়েছে পটাশিয়াম যা বিভিন্ন ধরণের হৃদরোগ প্রতিরোধ করে এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, খেজুর শরীরের খারাপ ধরণের কোলেস্টেরল কমায় (LDL) এবং ভাল কোলেস্টেরলের (HDL) পরিমাণ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
খেজুরের কিছু উপকারিতা জানা হলো। সাধারণতঃ আমরা পবিত্র রমজান মাসে খেজুর খেয়ে থাকি। ইফতারের অন্যতম আইটে এই খেজুর। ইফতারিতে খেজুর না থাকলে মনে হয় যেন ইফতারিই অপূর্ণ থেকে গেল! তাই আমাদের ভাবনায় খেজুরের সাথে রমজানের একটা সম্পর্ক। আসলে শুধু রমজান মাসেই নয়, আমাদের খেজুর খাওয়া উচিত সারা বছরের প্রতিটি মাসের প্রতিটি দিন।
পুষ্টিগুণ ও স্বাদে খেজুর
পুষ্টিগুণ ও সুস্বাদে সৌদির খেজুর বিশ্বব্যাপী স্বতন্ত্র অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছে। এখানের রকমারি জাতের খেজুরের প্রতি সব মানুষের লোভ। মিসর এবং পারস্য উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ সৌদি থেকে সবচেয়ে বেশি খেজুর আমদানি করে।
বিভিন্ন রকমের খেজুর
সারা বিশ্বে কত রকমের খেজুর রয়েছে জানলে অবাক হবেন! ভাবতে পারেন সারা বিশ্বে রয়েছে অন্তত তিন হাজারেরও বেশি জাতের খেজুর। তাদের আকার, ধরন, রং, গন্ধ, পুষ্টিগুণও বিভিন্ন ধরনের হয়।
সৌদি আরবে ৪০০ রকমের, ইরানে ৪০০ রকমের, ইরাকে ৩৭০ রকমের, তিউনিশিয়ায় ২৫০ রকমের, ওমানে ২৫০ রকমের ও মরক্কোতে ২৪৪ রকমের খেজুর পাওয়া যায়।
জনপ্রিয় যেসব খেজুর রয়েছে তা হলো আজওয়া, মরিয়ম, আম্বার, আনবারা, ডিগ্রেট নূর, বারহি, ডেইরি, ডেগলেট, ইত্তিমা, কালমি, কুদরি, মাবরুম, মাকতুুম, মেডজল, সাফাওয়ি, সাগি, মুসকানি, ওয়ান্নাহ ইত্যাদি।
গুণে-মানে সবার সেরা ‘আজওয়া’
গুণে-মানে ‘আজওয়া’ জাতের খেজুরকে সবাই সেরা মনে করে। হাজার বছর যাবত মদিনা এবং এর আশপাশে আজওয়ার অসংখ্য বাগান রয়েছে। মৌসুমে পরিপক্ক খেজুর রফতানির জন্য এখানে ব্যবসায়ীরা আসে।
আরো কয়েক প্রকার
আজওয়ার পাশাপাশি আরো কয়েক প্রকার খেজুরের বেশ কদর। এরমধ্যে আনবারা, সাগি, সাফাওয়ি, মুসকানি, খালাস, ওয়াসালি, বেরহি, শালাবি, ডেইরি, মাবরুম, ওয়ান্নাহ, সেফরি, সুক্কারি, খুদরি উল্লেখযোগ্য।
কোথায় বেশি উৎপাদন হয়
বিভিন্ন দেশে খেজুর বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়ে থাকে। সেসব আবার বিশ্বব্যাপী রপ্তানিও করা হয়। ২০১৭ সালে খেজুর উৎপাদনে সবচেয়ে এগিয়ে আছে মিসর। প্রতিবছর এই দেশে উৎপাদন হয় অন্তত ১০ লাখ ৮৪ হাজার মেট্রিক টন খেজুর। এদের বেশির ভাগ খেজুর রপ্তানি হয় মরক্কো, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায়। মিসরের পরেই রয়েছে ইরানের নাম। এই দেশে প্রতিবছর উৎপাদন হয় অন্তত ৯ লাখ ৪৭ হাজার মেট্রিক টন খেজুর। যার বেশির ভাগ রপ্তানি হয় এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। যেমন ভারত ও মালয়েশিয়া। খেজুর উৎপাদনে এর পর রয়েছে সৌদি আরবের নাম। বার্ষিক এই দেশে উৎপাদন হয় আট লক্ষ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন খেজুর। এই দেশের বেশির ভাগ খেজুর রপ্তানি হয় মূলত জর্ডান, ইয়েমেন ও কুয়েতে।
এ ছাড়া ইরাকে ছয় লাখ ৭৫ হাজার, পাকিস্তানে পাঁচ লাখ ৫৬ হাজার, আলজেরিয়ায় চার লাখ ৮৫ হাজার, সুদানে চার লাখ ৩৫ মেট্রিক টন খেজুর উৎপাদন হয় প্রতিবছর।
খেজুরের দরদাম
নানা জাতের এসব খেজুরের আকার ও মানভেদে দরদাম নির্ধারিত হয়। মার্কেটে সর্বৎকৃষ্ট মানের আজওয়া খেজুর কিলোপ্রতি বিক্রি হয় ৬০ থেকে ৮০ রিয়াল দরে। দ্বিতীয় শ্রেণির আজওয়ার দাম ৪০ থেকে ৬০ রিয়াল। ভাল মানের আনবারার কিলো ৪০ থেকে ৫০ রিয়াল। তা ছাড়া মাবরুম, সাফাওয়ি সাধারণত ২০ থেকে ৩০ রিয়ালে বিক্রি হয়। খুদরি পাওয়া যায় ৩০ থেকে ৪০ রিয়ালে।
খেজুর বরকত আনে
‘আমাদের খেজুর বরকত আনে’-এই শ্লোগানে প্রতি বছর মদিনায় খেজুরমেলা অনুষ্ঠিত হয়। মেলায় অন্তত দেড় মিলিয়ন কিলো মদিনার খেজুর বিক্রি হয়। প্রতিটি স্টল বিশেষ সুবিধা ঘোষণা করে ক্রেতাদের কাছে টানার নানা কৌশল অবলম্বন করে বিক্রেতারা। স্বাস্থ্যসম্মত খেজুর পরিবেশনে পৌর কতৃপক্ষের কঠোর নজরদারি থাকে।
কৃষিপরামর্শের জন্য স্মার্ট খেজুর প্রোগ্রাম
কৃষকদের যুগপযোগী পরামর্শ দানের জন্য সৌদিতে অনুষ্ঠিত হয় স্মার্ট খেজুর প্রোগ্রাম। প্রোগ্রামে রিয়াদ, কাসিম, হায়েল, তাবুক এবং মদিনা সহ যেসব অঞ্চল খেজুর উৎপাদনে এগিয়ে সেখানকার কৃষকদের নানা কৃষি-পরামর্শ প্রদান করা হয়। খেজুরচারা রোপন, কলম দেওয়া, সেচব্যবস্থা এবং সুষম সার ব্যবহারের আধুনিক পদ্ধতি শেখানো হয়।
যে খেজুরে কবিতা হয়
বাহিরের পর্যটকরা সৌদির হালওয়াতুল জাওফ খেজুরটি বেশি পছন্দ করেন। শতশত বছর যাবত এ জাতের খেজুর তাদের চোখে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। হালওয়াতুল জাওফ নিয়ে স্থানীয়রা বেশ গর্ব করেন। আরব কবি-সাহিত্যিকরা এই খেজুর নিয়ে কবিতাও আবৃত্তি করেন। আল জাওফ অঞ্চলে প্রতি বছর প্রায় বারো লাখ গাছ এ খেজুর উৎপাদন করে।
খেজুরের জাত দুই হাজারের উপরে
কিং আবদুল আজিজ ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. আকরাম বালিলু একটি বিশেষ টিম নিয়ে মদিনার আজওয়া খেজুর নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর দাবি, বিশ্বব্যাপী অন্তত দুই হাজার জাতের খেজুর পাওয়া যায়। সৌদি আরবে চার শ জাতের খেজুর আছে।
সৌদিতে খেজুরের বার্ষিক উৎপাদন
সৌদিতে প্রতি বছর নানা জাতের প্রায় এগারো লাখ টন খেজুর উৎপন্ন হয়। দেশটি বিশ্বের অন্তত ১৫ শতাংশ খেজুর উৎপাদন করে। মরু অঞ্চলের প্রচন্ড উষ্ণতা ও প্রতিকুল পরিবেশেও খেজুর বৃক্ষ ফল দেয়।
খেজুর শক্তিবর্ধক খাদ্য
খেজুর পূর্ণ খাদ্য ও শক্তি বর্ধনে অতুলনীয়। খেজুর আহারে প্রাণসঞ্চারিত হয়। ব্লাড প্রেসারের জন্য এটি খুবই উপকারী। এতে আছে প্রচুর ভিটামিন বি। যা ভিটামিন বিসিক্স মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। খেজুরের পুষ্টি উপাদান সম্পর্কে বলা হয়, চারটি বা ৩০ গ্রাম পরিমাণ খেজুরে আছে ৯০ গ্রাম ক্যালোরি, এক গ্রাম প্রোটিন, ১৩ মি.লি. গ্রাম ক্যালসিয়াম, ২ দশমিক ৮ গ্রাম ফাইবার। এছাড়াও খেজুরের রয়েছে আরও অনেক পুষ্টিগুণ।
দুধ ও খেজুরের সঙ্গে খেজুরের উপকারিতা দ্বিগুণ
অসুস্থতার পর শারীরিক দুর্বলতা, মানসিক অবসাদ এবং ক্লান্তিতে খেজুরের অসামান্য উপকারিতা। খেজুর পেট খারাপ দূর করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তি দেয়। দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে খেজুরের পুষ্টিগুণ বেড়ে যায় আর সঙ্গে মধু দিলে তার দ্বিগুণ উপকারিত
Leave a Reply