সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের দাফন আগামীকাল রোববার সিলেট নগরের রায়নগর এলাকায় তাদের পারিবারিক কবরস্থানে হবে। এর আগে বেলা দুইটায় নগরের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ সাবেক অর্থমন্ত্রীর মৃত্যুতে দুই দিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এর অংশ হিসেবে শনি ও রোববার আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীরা কালো ব্যাজ ধারণ করবেন।
শনিবার দুপুর ১২টায় নগরের ধোপাদীঘিরপাড় এলাকার বাসায় আবুল মাল আবদুল মুহিতের পরিবারের লোকজনের সঙ্গে সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাদের এক বৈঠক হয়। এরপর এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন।
ওই যৌথ সভায় সভাপতিত্ব করেন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ। মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসাইনের সঞ্চালনে সভায় জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী, সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ) আসনের সাংসদ হাবিবুর রহমানসহ জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সভা থেকে জানানো হয়, শনিবার সন্ধ্যায় আবুল মাল আবদুল মুহিতের মরদেহ সিলেট নগরের বাসভবনে নিয়ে আসা হবে। সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কাল দুপুর ১২টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত নগরের চৌহাট্টা এলাকার সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তার মরদেহ রাখা হবে। এরপর বেলা দুইটায় আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে জানাজা শেষে নগরের রায়নগর এলাকার পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হবে।
মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক অর্থমন্ত্রীর মৃত্যুতে সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ দুই দিনের শোক পালন করবে। এর অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীরা কালো ব্যাজ ধারণ করবেন। এ ছাড়া ঈদের পরদিন বাদ জোহর মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনায় হজরত শাহজালাল (রহ.) মসজিদে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল হবে। পাশাপাশি সব মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডায় দোয়া ও বিশেষ প্রার্থনা করার জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার আবুল মাল আবদুল মুহিত দিবাগত রাত ১২টা ৫৬ মিনিটে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।
আবুল মাল আবদুল মুহিত ১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। তৎকালীন সিলেট জেলা মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা আবু আহমদ আবদুল হাফিজ ও সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরীর ১৪ সন্তানের মধ্যে তৃতীয় সন্তান মুহিত। স্ত্রী সৈয়দা সাবিয়া মুহিত একজন ডিজাইনার। তিন সন্তানের মধ্যে কন্যা সামিনা মুহিত ব্যাংকার ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞ। বড় ছেলে সাহেদ মুহিত বাস্তুকলাবিদ এবং ছোট ছেলে সামির মুহিত শিক্ষক।
যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে উচ্চতর ডিগ্রি নেয়া আবদুল মুহিত বরাবরই একজন মেধাবী মানুষ ছিলেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন তিনি। পরের বছর একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এর আগে অংশ নেন ভাষা আন্দোলনে। ছাত্রজীবনে সলিমুল্লাহ হল ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।
১৯৫৬ সালে আবদুল মুহিত যোগ দেন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে (সিএসপি)। সিএসপিতে যোগ দিয়ে তিনি ওয়াশিংটন দূতাবাসে পাকিস্তানের কূটনীতিকের দায়িত্ব নেন এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের জুনে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করেন। ওই সময় তিনি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সিএসপি হওয়ার পর মুহিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, কেন্দ্রীয় পাকিস্তান ও পরে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে তিনি পরিকল্পনাসচিব হন। এর আগে পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনের উপসচিব থাকাকালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্যের ওপর ১৯৬৬ সালে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন তিনি। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে এটিই ছিল এ বিষয়ে প্রথম প্রতিবেদন।
বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় তিনি পরিচিত ব্যক্তি ছিলেন। ১৯৭২-৭৩ সালে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংকের সদস্য হলে সেপ্টেম্বরে মুহিত হন বিশ্বব্যাংকে বাংলাদেশের পক্ষে ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা গ্রুপের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক। ১৯৭৭-৮১ পর্যন্ত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব ছিলেন তিনি এবং ১৯৮১ সালে স্বেচ্ছায় সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন। ১৯৮২ সালে ২৪ মার্চ এইচ এম এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে তাকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী করার প্রস্তাব দিলে তিনি শর্ত সাপেক্ষে রাজি হন। শর্তটি ছিল নির্দলীয় সরকার গঠন করে জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।
এরশাদ কথা না রাখলে দুই বছরের মাথায় মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেন মুহিত। এরপর তিনি বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। তিনি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। সরকার তাকে ২০১৬ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে। স্বাধীনতাযুদ্ধে অনন্য ভূমিকা রাখার স্বীকৃতি হিসেবে তা দেয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধ, জনপ্রশাসন, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক বিষয়ে মুহিত বই লিখেছেন ৪০টি।
অর্থমন্ত্রী হিসেবে আবুল মাল আবদুল মুহিত এখন পর্যন্ত ১২টি বাজেট উপস্থাপন করেছেন, যার ১০টি আওয়ামী লীগ সরকার আমলের।
Leave a Reply