ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলন আগামী ১২ মে অনুষ্ঠিত হবে। প্রায় ২০ হাজার নেতাকর্মী এতে উপস্থিত হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এজন্য শহরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে এ সম্মেলনের শুধু মঞ্চ তৈরিতেই ব্যয় করা হচ্ছে অন্তত ৫০ লাখ টাকা।
এক লাখ পাঁচ হাজার বর্গফুট জুড়ে তৈরি এ মঞ্চে ১৫ হাজার চেয়ারে বসার ব্যবস্থা থাকছে।
২০১৬ সালের ২২ মার্চ জেলা আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সম্মেলনে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম জেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করেন। পরে ২০১৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়।
ফরিদপুর আওয়ামী লীগের রাজনীতির পট পরিবর্তনের পর সম্মেলন নিয়ে গত দুই বছর ধরে গ্রুপিং, লবিং ও কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে দৌড়-ঝাঁপ চলছে।
এজন্য শহরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে এ সম্মেলনের শুধু মঞ্চ তৈরিতেই ব্যয় করা হচ্ছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা। ১ লাখ ৫ হাজার বর্গফুট জুড়ে তৈরি এ মঞ্চে ১৫ হাজার চেয়ারে বসার ব্যবস্থা থাকছে। বৈশাখী ঝড়ের চিন্তা মাথায় রেখে লোহার পোল দিয়ে মূল মঞ্চের কিছু অংশ জুড়ে তৈরি করা হয়েছে বিশেষ মঞ্চ। যাতে কালবৈশাখী ঝড়েও মঞ্চ ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য।
জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন ত্রিবার্ষিক এই সম্মেলনে ফরিদপুরের নয়টি উপজেলা ছাড়াও বৃহত্তর ফরিদপুরের বিভিন্নস্থান হতে প্রায় ২০ হাজার নেতাকর্মীর উপস্থিতি আশা করছেন তারা। তাদের জন্য ওইদিন দুপুরে খাবারের ব্যবস্থাও করা হবে। বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এ সম্মেলন মঞ্চকে ঘিরে শহরবাসীর মাঝে ব্যাপক কৌতুহল তৈরি হয়েছে।
রাজেন্দ্র কলেজ মাঠ জুড়ে দৃশ্যমান হাজার হাজার বাঁশ গেড়ে সেখানে কি করা হবে এমন জিজ্ঞাসাও করছেন অনেকে। সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজধানী কিংবা বিভাগীয় নগরের বাইরে এর আগে এতো বড় সম্মেলন মঞ্চ করা হয়নি। তবে ফরিদপুরে এই ধরনের মঞ্চ তৈরির ধারনাটি নেয়া হয়েছে রাজবাড়িতে দলের একটি অনুষ্ঠানের মঞ্চ দেখে। যদিও সেটি এতো বড় ছিলোনা।
ফরিদপুরের আওয়ামী লীগের এই সম্মেলনের মঞ্চ তৈরির কাজও করছে রাজবাড়ির নূর ডেকোরেটর নামে একটি প্রতিষ্ঠান। ওই ডেকোরেটরের মালিক নূরুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে বলেন, ১ লাখ ৫ হাজার বর্গফুটের এই মঞ্চ তৈরিতে প্রতিদিন দিনরাত মিলিয়ে ৫০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। প্রায় একমাস লাগে এমন মঞ্চ তৈরিতে। তবে আমরা সময় কম পেয়েছি। এজন্য দিনরাত কাজ করা হচ্ছে। তিনি জানান, ১৫ হাজার বাঁশ এবং পঞ্চাশটি বৈদ্যুতিক পোল দিয়ে মঞ্চ করা হচ্ছে। পনের হাজার চেয়ারে পনের হাজার অতিথি থাকবেন। তাদের জন্য মঞ্চ জুড়ে থাকবে তিনশো ফ্যান। এই মঞ্চ তৈরিতেই ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা। এটি শুধু মঞ্চ তৈরিতেই ব্যয় হবে বলে তিনি জানান। নূরুল ইসলাম বলেন, রাজধানী বা মহানগরের বাইরে এমন মঞ্চ এর আগে হয়নি। রাজবাড়িতে এর আগে একটি মঞ্চ হলেও সেটি এতো বড় ছিলোনা।
জেলা আওয়ামী লীগের এই ত্রিবার্ষিক সম্মেলনকে কেন্দ্র করে গত মাসের ১৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়েছে বর্ধিত সভা। ওই সভায় সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির সাথে অভ্যর্থনা কমিটি, অর্থ কমিটি, প্রচার-প্রকাশনা কমিটি, মঞ্চ ও সাজসজ্জা কমিটি, আইন-শৃঙ্খলা কমিটিম স্বাস্থ্য কমিটি, অতিথি আপ্যায়ন কমিটি, খাদ্য সরবরাহ কমিটি এবং যোগাযোগ ও পরিবহন কমিটি গঠন করা হয়। মঞ্চ ও সাজসজ্জা কমিটির আহ্বায়ক এবং অর্থ কমিটির সদস্য ঝর্ণা হাসান বলেন, ফরিদপুর বঙ্গবন্ধুর জেলা। এজন্য ফরিদপুরে একটি জাঁকজমকপূর্ণ সম্মেলন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর আগে রাজবাড়িতেও বেশ জাঁকজমকপূর্ণ সম্মেলন করা হয়েছে। তারচেয়েও বড় আকারের প্রস্তুতি রয়েছে আমাদের। তিনি বলেন, আমাদের হাজার বিশেক নেতাকর্মীর উপস্থিতির টার্গেট রয়েছে। পাশর্^বর্তী জেলা থেকেও আমন্ত্রিত অতিথি আসবে। মঞ্চের ব্যয়ের ব্যাপারে তিনি বলেন, বর্তমানে একজন শ্রমিকের বেতনও বেড়েছে। আগে টাকার দাম ছিলো। কিন্তু এখন সবকিছুর দামই বেড়েছে। তাই মঞ্চ তৈরিতে সবমিলিয়ে একটি ভালো অ্যামাউন্টই ব্যয় হবে। তবে ঠিক কি পরিমাণ টাকা এতে খরচ হবে সেটি তিনি নির্দিষ্ট করে জানাননি।
দলীয় সূত্র জানায়, ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের এবারের এই ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে উদ্বোধক হিসেবে থাকবেন কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। প্রধান অতিথি রয়েছেন প্রেসিডিয়াম মেম্বার কাজী জাফরুল্লাহ। বিশেষ অতিথি হিসেবে রয়েছেন প্রেসিডিয়াম মেম্বার ড. আব্দুর রাজ্জাক, লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান সহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম সম্মেলনে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে।
ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মাসুদ হোসেন বলেন, সম্মেলন বাস্তবায়নে সবধরনের প্রস্তুতিই গ্রহণ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত সবকিছু ভালোভাবেই চলছে। মঞ্চ তৈরির কাজও ভালোভাবেই চলছে। কি পরিমাণ অর্থ মঞ্চ তৈরিতে ব্যয় হচ্ছে সেটি সংশ্লিষ্ট কমিটি বলতে পারবেন বলে তিনি জানান।
ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুবল চন্দ্র সাহা বলেন, সম্মেলন সফল ও সার্থক করে তুলতে দলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা সর্বাত্মক শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। কোনোপ্রকার অনভিপ্রেত পরিস্থিতির মুখোমুখি হবো বলে আশা করছি। সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করছে। আশা করছি একটি সফল সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
এদিকে ফরিদপুর আওয়ামী লীগের রাজনীতির পটপরিবর্তন, বিশেষত ফরিদপুর সদর আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফের যুগের অবসানের পর বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত এই সম্মেলন নিয়ে দুই বছর ধরে গ্রুপিং, লবিং ও দৌড়ঝাঁপ চলেছে।
সাবেক মন্ত্রী, ফরিদপুর সদরের এমপি খন্দকার মোশাররফ হোসেনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পতনের পর থেকেই ফরিদপুরে আওয়ামী রাজনীতি একাধিক ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। বর্তমানে সেই বিভক্তি এখন দুটি অংশে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ধারায় চলছে। এর একটি হলো আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ সমর্থিত অংশ এবং অপরটিতে রয়েছে যুবলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সাংসদ মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন সমর্থিত অংশ।
সম্মেলন সামনে রেখে কেন্দ্রীয় নেতাদের দৃষ্টিতে আসার জন্য জেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ প্রাপ্তির আশায় শহরের আনাচে-কানাচে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রার্থী ও তার সমর্থকরা।
এই পদ-পদবী প্রাপ্তির প্রচারণায় রয়েছেন সভাপতির তালিকায় জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বিপুল ঘোষ, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শামীম হক, সাবেক কেন্দ্রীয় যুবলীগের সদস্য মো. ফারুক হোসেন ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শামসুল হক।
সাধারণ সম্পাদকের পদপ্রত্যাশী আশা করছেন, বর্তমান ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মাসুদ হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ঝর্না হাসান, ফরিদপুর পৌরসভা মেয়র অমিতাভ বোস, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মো. লিয়াকত হোসেন, ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক দীপক কুমার মজুমদার, জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক জিয়াউল হাসান ও ফরিদপুর পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি ড. যশোদা জীবন দেবনাথ।
Leave a Reply