1. admin@thedailypadma.com : admin :
উৎসব ঈদ আনন্দ সবই তাদের কাছে এখন স্মৃতি - দ্য ডেইলি পদ্মা
রবিবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৫, ০৫:৩৫ অপরাহ্ন

উৎসব ঈদ আনন্দ সবই তাদের কাছে এখন স্মৃতি

  • Update Time : শনিবার, ৭ মে, ২০২২
  • ৪১৪ Time View

স্বজনশূন্যতায় বৃদ্ধাশ্রমে প্রতিক্ষণ দগ্ধ হচ্ছেন প্রবীণরা। উৎসব ঈদ আনন্দ সবই তাদের কাছে এখন স্মৃতি। স্বামী-স্ত্রী সন্তান স্বজন অর্থ বিত্ত সব হারিয়ে প্রবীণ নিবাসই এখন তাদের কাছে আপন। এখানে আয়েশে থাকলেও রাত-দিন বুকে ধাউ ধাউ আগুন জ্বলে। দিন মাস বছর শেষে ঋতু বদলায়। কিন্তু শীতল হয় না প্রবীণের বুক। স্বজনহীনতার যন্ত্রণায় অঙ্গার হয়ে পড়া অগ্রজদের মনের আগুন নেভাতে কেউ আসে না। শেষ জীবনে এভাবেই বেঁচে থাকার কথা জানালেন বৃদ্ধাশ্রমে থাকা প্রবীণরা।

ঈদের দিন দুপুরে আগারগাঁও প্রবীণ নিবাসে গিয়ে দেখা যায় পুরো ভবন নিস্তব্ধ। প্রধান ফটকের নিরাপত্তাকর্মী জানান সকালে কিছু লোক আসছিল। এখন সবাই বিশ্রাম নিচ্ছেন। এরই মধ্যে গেটের বাইরে পায়চারি করা একজনকে দেখিয়ে বললেন, ‘উনি প্রবীণ নিবাসে থাকেন। উনার সাথে কথা বলতে পারেন।’

তার কথামতো তার সামনে গিয়ে পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলাম ‘কেমন আছেন, ঈদ কেমন কাটল’। এ কথা শুনে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘মরা মানুষ কি ঈদ করতে পারে’? তার এমন উক্তির ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শুনুন আমরা এখানে যারা আছি তারা সব হারিয়ে এসেছি। এখানে আমাদের পরিবার সন্তান ছাড়া আর কোনো কিছুর অভাব নেই। কিন্তু অতীত আমাদের শেষ করে দিচ্ছে।’
তার ভাষ্য, ‘অনেক বছর থেকে এখানে আছি। কিন্তু একটা মুহূর্তও শান্তিতে নেই। প্রতিটি সময় স্বজনদের জন্য বুকের মধ্যে আগুন জ্বলে। এভাবে পুড়তে পুড়তে অঙ্গার হয়ে গেছি। বলতে পারেন এখন মরে গেছি। কিন্তু তারপও শান্তি নেই। আগুনতো নেভে না।’

ঈদ পালনের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ঈদ আমাদের জন্য এখন অতীত। এমনিতেই সারা বছর মনের যন্ত্রণায় পুড়তে থাকি। আর ঈদ যখন আসে বুকের মধ্যে ধাউ ধাউ আগুন আরো বেড়ে যায়। কারণ তখন স্ত্রী-সন্তানদের সাথে অতীতের ঈদের অনেক স্মৃতি চোখের সামনে ভাসে। এতে মনের যন্ত্রণা আরো বাড়ে।’

তার ভাষ্য ‘এখানে যারা আছেন তাদের সবার অবস্থা একই। আমরা বেঁচেও মরে আছি। এত বছর ধরে স্বজনহীন শূন্যতায় পুড়তে পুড়তে আমরা অঙ্গার হয়ে গেছি। কিন্তু একটা মুহূর্তের জন্যও মনে শান্তি পাই না। এখানে সবই আছে। কিন্তু বুকের আগুন নেভানোর একটা মানুষ নেই।’ সব শেষে পরিচয় জানতে চাইলে তিনি তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

এর কিছুক্ষণ পর একজন ভেতর থেকে বের হয়ে এসে আলোচনায় যুক্ত হন। তিনি জানান, প্রায় এক যুগ ধরে এখানে আছেন। তার ভাষ্য, ‘ঢাকার ধানমন্ডিতে তার বাড়ি আছে। কিন্তু তিনি এখন সন্তানদের কাছে মেহমান।’
তিনি বলেন, ‘আমার টাকার অভাব নেই। অভাব শুধু স্বজনের। যত দিন এখানে আছি তার একটা দিনও শান্তি পাইনি। সন্তানদের কথা মনে হলে একা একা কান্না করি। আমার নিজেকে সামলে নেই। কারণ সন্তানরা এখন আমাকে মেহমান মনে করে। মনে হলে দেখতে আসে। কিছুক্ষণ কথা বলেন চলে যায়।’

নানা পদের বাহারি খাবার ভীষণ পছন্দ নাদিরা বেগম নীরার। তার মতে, মানুষ বাঁচেই খাবারের জন্য। আতিথেয়তাও তার ভীষণ প্রিয়। ঈদের দিনে প্রবীণ নিবাসে তার ভাড়া করা রুমে যেতেই, তাই চায়ের নিমন্ত্রণ। ভীষণ যতেœ বানানো চা হাতে নিয়েই জীবনের মধুর স্মৃতির ডালা নিয়ে বসলেন নীরা। সত্তুর বছরের জীবনের বেশিরভাগটাই কেটেছে বেহিসেবে। তারপরও ভালো আছেন, সব মানিয়ে নিয়ে বেশ চলছে জীবন।

প্রবীণ নিবাসের অন্য বাসিন্দা আবু তৈয়বের জীবনের গল্পটাও বেসুরো। পরিবারের সবাইকে নিয়ে বড় একটা সংসার গড়ার ইচ্ছে ছিলো তার। সারা জীবন সেই স্বপ্ন নিয়েই সঞ্চয় তৈরি করেছিলো। তবে কাছের লোকের প্রতারণায় সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্ন। আবারো সব ঠিক হয়ে যাবে সেই প্রত্যাশা নিয়ে প্রহর গুণছেন আবু তৈয়ব।

স্ত্রী-সন্তানদের থাকার জন্য ৯১ লাখ টাকা দিয়ে রাজধানীতে একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন মুজিবুল হক। কিন্তু সেখানে তিনি থাকেন না। গত ২০ বছর ধরে একা একা থাকেন আগারগাঁওয়ের প্রবীণ নিবাসে। মাঝে মাঝে তার স্ত্রী-সন্তানরা এখানে আসেন দেখা করতে।

নিজের ফ্ল্যাট থাকার পরও বৃদ্ধাশ্রমে থাকার কারণ জানতে চাইলে মুজিবুল হক বলেন, ‘আমি এখানে আমার নিজের ইচ্ছাতেই আছি। এখানে আসার পেছনে আমার কোনো রহস্য নেই। আমার এখানে একা থাকতে ভালো লাগে।’

একা একা ঈদ করতে ভালো লাগে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ভালোই লাগছে। সকালে গোসল করে সাদা পাঞ্জাবি পরেছি, সেমাই খেয়েছি। দুপুরে সবার সঙ্গে ডাইনিংয়ে বসে বিরিয়ানি খেলাম। ঈদের সময় আলাদা করে পরিবারের কথা মনে পড়ে না। কারণ তারা সব সময় আমার মনের মধ্যেই থাকে।

ঈদের দিন কারও সঙ্গ পেলে ভালো লাগত না? জিজ্ঞেস করলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন মুজিবুল হক। বলেন, কেউ যদি অহমিকা প্রকাশ করে, তাহলে আমি কিছু করতে পারব? আমি আমার পরিবারকে ৯১ লাখ টাকা দিয়ে একটা অ্যাপার্টমেন্ট করে দিয়েছি। তারা সেই অ্যাপার্টমেন্টে আছে। আমি ওই পরিবারের প্রধান ছিলাম। আমি এখানে আমার নিজের ইচ্ছাতেই চলে এসেছি।

ঈদের খুশি প্রবীণ নিবাসে এই মানুষগুলোর কাছে রঙহীন, সীমাহীন কষ্টের এক আলেখ্য। এই মানুষগুলোর খুশির জন্য বিশেষ খাবার এবং আনন্দ-উদযাপনের ব্যবস্থা করেছে প্রবীণ নিবাস কর্তৃপক্ষ। আত্মীয় পরিজন কাছে না থাকলেও তাদের স্মৃতি হাতরেই আরেকটি ঈদের প্রত্যাশা জীবন সায়াহ্নে।

তিনি জানান, এখানে যারা আছেন তাদের প্রত্যেকেই উচ্চবিত্ত। কিন্তু অভাব একটাই স্বজন নেই। গল্পের মধ্যে পরিবার পরিজনের প্রসঙ্গ এলে উপস্থিত কেউই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন না। স্বজন কাছে না থাকার যন্ত্রণা কঠিন। এর চেয়ে মরে যাওয়াটাই সহজ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

প্রবীণ নিবাসের ব্যবস্থাপক ও বার্ধক্য বিশেষজ্ঞ গবেষক ডা: মহসীন কবির জানান, তাদের এখানে বর্তমানে ৩০ জন প্রবীণ রয়েছেন। তাদের প্রত্যেকেই বিত্তশালী জানিয়ে তিনি বলেন, এখানে যারা আছেন তারা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। কিন্তু পারিবারিক নানান জটিলতায় তারা এখানে থাকছেন। কিন্তু দূরে থাকলেও প্রত্যেকেই স্বজনদের জন্য হাহাকার করেন। মৃত্যুর পর যাতে সন্তানরা লাশ দাফন না করে এমনও কথা কেউ কেউ বলেন। এতেই বুঝা যায় স্বজনদের ওপর তাদের অভিমান কতটুকু। তিনি বলেন, প্রবীণদের জন্য সবচেয়ে বেশি সমস্যা স্বাস্থ্যসেবা। কারণ অন্যদের তুলনায় তাদের স্বাস্থ্যগত বিষয়গুলো জটিল এবং ব্যয়বহুল। প্রবীণরা স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের সাথেই থাকতে চান। কিন্তু পারিবারিক কাঠামোতে যে পরিবর্তন এসেছে তার সাথে প্রবীণদের জন্য পর্যাপ্ত সেবাব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
স্বপ্নপূরণের ক্ষণগণনা
অপেক্ষা উদ্বোধনের
দিন
ঘন্টা
মিনিট
সেকেন্ড
© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
Theme Customized By BreakingNews