
# নজর এড়াতে বদলে ফেলা হয়েছে রং
# যৌথ অভিযানের প্রস্তুতি
কার্নেট সুবিধায় আনা আরো ৭০ গাড়ির খোঁজ করছে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ। গত বুধবার ২৭ কোটি মূল্যের বিলাস বহুল রোলস রয়েলস জব্দের পর নড়ে চড়ে বসেছে শুল্ক গোয়েন্দা। উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, রং বদলে চলাচল করছে কার্নেট সুবিধায় আনা আরো ৭০ বিলাসবহুল গাড়ি। দ্রুত এ সব গাড়ি চিহ্নিত করে জব্দ করা হবে। পাশাপাশি এগুলোকে শুল্কায়িত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
সূত্র জানায়, শুল্কায়ন ছাড়াই গত প্রায় আড়াইমাস আগে খালাস নেওয়া হয়েছে বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের গাড়ি ‘রোলস রয়েস’। কাঁচামালের সঙ্গে এ গাড়ি নেওয়া হয় চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায়। সেখান থেকে লুকিয়ে গাড়িটি আনা হয় ঢাকার বারিধারায়। ৭০ দিন আগে বন্দর থেকে খালাস নেওয়া হলেও শুল্কায়ন সম্পন্ন করা হয়নি। মূলত শুল্ককর ফাঁকি দিতেই গাড়িটি লুকিয়ে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছে। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। বিলাসবহুল এ গাড়িটিতে নজর রেখে শেষ পর্যন্ত দেশের নামি এক ব্যবসায়ীর বাস ভবনের গ্যারেজ থেকে জব্দ করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। ওই ব্যবসায়ীর নাম শরিফ জহীর। তিনি বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক এবং পোশাক খাতের স্বনামধন্য অনন্ত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। গত বুধবার গাড়িটি জব্দ করা হয়। কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, গাড়িটি জব্দ করতে না পারলে প্রায় ২৪ কোটি টাকার রাজস্ব হারাতো সরকার।
কাস্টমস গোয়েন্দার যুগ্ম পরিচালক মো. শামসুল আরেফিন খান জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম ইপিজেডের জেড অ্যান্ড জেড ইনটিমেটস লিমিটেড একটি প্রতিষ্ঠান ছয় হাজার ৭৫০ সিসির কলিনান এসইউভি মডেলের বিলাসবহুল রোলস রয়েস আমদানি করেছে। স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকেল ধরনের গাড়িটির আমদানির জন্য মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে এলসি খোলা হয়। ২৭ এপ্রিল বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে গাড়িটি যুক্তরাজ্যের ভারটেক্স অটো লিমিটেড থেকে গাড়িটি আমদানি করা হয়েছে। গাড়িটি শুল্কায়ন ছাড়াই খালাস নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেয় কাস্টমস গোয়েন্দা। আমদানি নথিতে গাড়ির মূল্য দেখানো হয়েছে দুই লাখ পাউন্ড।
যাতে দেখা যায়, গাড়িটি বন্দর থেকে স্কট করে জেড অ্যান্ড জেড ইনটিমেটস লিমিটেডে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত ৪ জুলাই পর্যন্ত অর্থাৎ খালাসের ৭০ দিন পরও শুল্কায়ন কার্যক্রম শেষ করা হয়নি। কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তারা গোপনে জানতে পারেন, কাস্টমসকে অবহিত না করেই ১৭ মে রাতে চট্টগ্রাম ইপিজেড থেকে অবৈধভাবে অপসারণ করা হয়েছে। বেআইনিভাবে অপসারণ করা গাড়িটির অবস্থান শনাক্ত করা হয়। যাতে দেখা যায়, গাড়িটি চট্টগ্রাম থেকে বারিধারায় ওই কোম্পানির (জেড অ্যান্ড জেড ইনটিমেটস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরিফ জহীরের বাসার গ্যারেজে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। পরে কাস্টমস গোয়েন্দার একটি দল গাড়িটি গ্যারেজ থেকে জব্দ করেন।
শামসুল আরেফিন খান আরো জানান, গাড়িটি সিপিসি ১৭০ এর সুবিধায় শুল্কমুক্ত আমদানি করা হয়েছে। যদিও সিপিসি ১৭০ অনুযায়ী ২০০০ সিসি পর্যন্ত কার আমদানির জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রযোজ্য হবে। তবে গাড়ির আমদানি কাগজপত্র ও জব্দ করা বিলাসবহুল গাড়িটির বনেটে থাকা স্টিকার অনুযায়ী, রোলস রয়েস গাড়িটি ছয় হাজার ৭৫০ সিসির। সিপিসি অনুযায়ী গাড়িটি শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না। বিলাসবহুল গাড়িতে আমদানি শুল্ককর ৮৫০ শতাংশ। গাড়িটি শুল্কমুক্ত সুবিধা না পেলে শুল্ককর দিতে হবে প্রায় ২৪ কোটি টাকা। আমদানিকারক গাড়ির মূল্য ঘোষণা দেওয়া হয়েছে দুই লাখ পাউন্ড, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় দুই কোটি ২২ লাখ টাকা। শুল্ককরসহ গাড়ির মূল্য প্রায় ২৭ কোটি টাকা। গাড়িটি জব্দ না হলে সরকার এ শুল্ককর থেকে বঞ্চিত হতো। গাড়িটি শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে কি না-তা খতিয়ে দেখতে কাস্টমসকে অনুরোধ জানানো হবে। আমদানিকারক বে আইনিভাবে শুল্কায়ন প্রক্রিয়া না করেই গাড়িটি গ্যারেজে লুকিয়ে রেখে শুল্ক আইনের বিধান ভঙ্গ করেছেন। এক্ষেত্রে চোরাচালান হিসেবে গণ্য হওয়ার অপরাধ হয়েছে। জব্দ করা গাড়িটি ঢাকা কাস্টম হাউসের শুল্ক গুদামে জমা দেওয়া হয়েছে।
আমদানি অনুমতি (ইমপোর্ট পারমিট) পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জেড অ্যান্ড জেড ইনটিমেটস লিমিটেড হংকং এবং বাংলাদেশের যৌথ বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত। এটি পোশাক খাতের অনন্ত গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান (কৌশলগত বাণিজ্যিক অংশীদার বা এসবিইউ)।
কোম্পানির তথ্যানুযায়ী, এ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরিফ জহীর। কোম্পানিতে তার শেয়ার ২২ দশমিক ৫০ শতাংশ। কোম্পানির চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন শওকত আলী চৌধুরী। তার মালিকানা শেয়ার ২২ দশমিক ৫০ শতাংশ। এছাড়া পরিচালক হিসেবে রয়েছেন তাসলিমা আম্বারিন ও আসিফ জহীর। কোম্পানিতে দুইজনের শেয়ার রয়েছে ২২ দশমিক ৫০ শতাংশ করে। আসিফ জহীর অনন্ত গ্রুপের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক। শ্রীলঙ্কার নাগরিক লিপেরুমা বাচ্চিজি কোম্পানির পার্টনার হিসেবে রয়েছেন, যার মালিকানা রয়েছে ১০ শতাংশ।
এদিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে কার্নেট নেট ডি প্যাসেজ সুবিধায় আমদানি হওয়া অন্তত ৭০টি বিলাসবহুল গাড়ি রং বদলে দেশের রাস্তায় চলাচল করছে। শুল্ক ছাড়া খালাস হওয়ায় এসব গাড়ি কোথায় রয়েছে এর কোন তথ্য নেই কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে। এসব গাড়ি উদ্ধারে চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষ পুলিশসহ বিভিন্ন আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সহায়তাও চেয়েছে। কিন্তু এখনো এসব গাড়ি উদ্ধার করা যায়নি। কাস্টমস কর্মকর্তার বলছেন, এসব গাড়ি উদ্ধারে শুল্ক গোয়েন্দাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের চেষ্টা চলমান রয়েছে।
এনবিআর সূত্র বলছে, বাংলাদেশি নাগরিক যারা বিদেশে বসবাস করেন বা বিদেশে নাগরিকত্ব রয়েছে এরকম কিছু লোক ২০১১ এবং ২০১২ সালের দিকে কার্নেট ডি প্যাসেজের আওতায় বাংলাদেশে বিএমডব্লিও, মার্সিডিস বেঞ্জ, ল্যান্ড ক্রুজার, ল্যান্ড রোভার, জাগুয়ার, লেক্সাসসহ বিভিন্ন ব্রান্ডের গাড়ি নিয়ে আসে। শর্ত ছিল, ট্যুরিস্ট হিসেবে ছয় মাস এগুলো বাংলাদেশে ব্যবহার করবে। আবার তারা যখন বাংলাদেশ ত্যাগ করবে, তখন এই গাড়িগুলো ফেরত নিয়ে যাবে। এ সংক্রান্ত অঙ্গীকারনামা দিয়ে গাড়িগুলো চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস দেওয়া হয় । এসব গাড়ি পরে বাজারে বিক্রি করা হয়েছে। এতে করে আইনের ব্যাত্যয় ঘটেছে। বিক্রি করার পর গাড়িগুলোর আগের রংও পরিবর্তন করা হয়েছে। যে কারণে গাড়িগুলো চিহ্নিতও করা যাচ্ছেনা।
সূত্র জানায়, রোলস রয়েস জব্দের পর বিলাসবহুল প্রায় ৭০টি গাড়ি কোথায় আছে, কার কাছে আছে সেটির অনুসন্ধান শুরু হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে জোরদার অভিযানে নামবে শুল্ক গোয়েন্দা তদন্ত অধিদপ্তর। সংস্থাটির মহাপরিচালক ড. আব্দুর রউফ বলেন, কারনেট সুবিধায় আনা অন্তত ৭০টি গাড়ি বাহিরে রয়েছে। সেগুলোকে চিহ্নিত করতে আমরা উদ্যোগ গ্রহন করেছি। শিগগিরই এ গাড়িগুলো উদ্ধারে অভিযান শুরু হবে।
Leave a Reply