বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আমি চট্টগ্রামের মানুষকে বলবো, এই সমাবেশকে আপনারা সফল করেছেন, আমরা আমাদের গণতন্ত্র ফিরে পেতে চাই। বাক স্বাধীনতাসহ আমাদের সব অধিকার ফিরে পেতে চাই। তাই এ লড়াই অনেক বড় লড়াই, শক্ত লড়াই। এ লড়াইয়ে আমাদের জিততেই হবে।’
বুধবার চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড মাঠে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, পুলিশের গুলিতে পাঁচ নেতাকর্মী নিহত ও খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিএনপির ডাকা বিভাগীয় মহাসমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, এ সরকার অনির্বাচিত সরকার, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার নয়। এ দেশের মানুষ তাদেরকে কখনো মেনে নেয়নি। এ বাংলাদেশকে তারা শ্মশান করে দিয়েছে। এই শেখ হাসিনা সব লুট করে বিদেশে পাচার করছে। এদিকে জনগণ না খেয়ে মরছে। প্রতিটা তরকারির দাম তিন থেকে পাঁচ গুণ বেড়েছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির দাম বাড়িয়েছে। শুনছি, বিদ্যুতের দাম আবার বাড়াবে। এরা লুটপাত করে কানাডার বেগমপাড়ায় বাড়ি বানায়। আর জনগণ কষ্টে দিনাতিপাত করছে।
তিনি বলেন, আজকের বিএনপির এই সমাবেশ আর সমেবেশ নেই, তা এখন মহাসমাবেশে পরিণত হয়েছে। আজকে আমরা এমন একটা জায়গা থেকে কথা বলছি, যার অদূরে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র। সেখান থেকে প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা করে দেশকে স্বাধীন করেছিলেন জিয়াউর রহমান।
খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করে মির্জা ফখরুল বলেন, আমাদের নেত্রী আজ বন্দি। তিনি ঠিকমতো চিকিৎসা পাচ্ছেন না। তারা আমাদের ভয় দেখায় আমাদের নেত্রীকে আবার জেলে পাঠাবেন। কিন্তু তারা জানে না, খালেদা জিয়া জেলকে ভয় পান না।
তিনি বলেন, এই সরকার বিচারবিভাগ, প্রশাসন, পুলিশ ও র্যাবকে দলীয়করণ করেছেন। আজ সারাদেশের আওয়ামী লীগ, যুবলীগ আর ছাত্রলীগের কর্মীরা জনগণের পকেট কেটে বিদেশে পাচারে সহযোগিতা করছে। তারা বলছে, দেশে দুর্ভিক্ষ আসছে। তেল কম খান, বিদ্যুৎ কম জ্বালান। আর আমরা বলি, তাহলে আপনারা ক্ষমতায় আছেন কেনো? আজই পদত্যাগ করেন।
সমাবেশে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন বলেন, আগামী ১০ ডিসেম্বরের পর থেকে খালেদা জিয়ার সরকার চলবে। যারা খালেদা জিয়াকে আবার কারাগারে পাঠানোর হুমকি দিচ্ছেন, ১০ ডিসেম্বরের পর তাদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। চট্টগ্রাম থেকে সরকার পতনের আন্দোলন শুরু হলো।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রামের জনগণ আজ দেখিয়ে দিয়েছে। মাঠ-ঘাট কানায় কানায় ভরে গেছে। এ জনসভা থেকে যে বার্তা পুরো বিশ্ববাসী পাবে সেটা একটাই, শেখ হাসিনা তুমি পদত্যাগ করো। তোমার ক্ষমতার ছাড়ার সময় হয়ে এসেছে। চট্টগ্রামের মাঠ থেকে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, এটা সহজে থামবে না। আমাদের নেতাকর্মীরা খাঁটি সোনায় তৈরি হয়েছে। দরকার হলে জীবন দিয়ে শেখ হাসিনার পতন ঘটাবো।’
নেতাকর্মীদের সমাবেশে আসতে বাধা দেয়া হয়েছে অভিযোগ করে আমীর খসরু বলেন, পুলিশের কিছু অংশ নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে হামলা চালিয়েছে। ঢাকা থেকে আসতে নেতাকর্মীদের বাধা দিয়েছে। অনেক নেতাকর্মীকে হোটেল-রাস্তা থেকে গ্রেপ্তার করেছে। এরপরও সমাবেশ থেমে নেই, নেতাকর্মীরা সকল বাধা অতিক্রম করে সমাবেশের মাঠে যোগ দিয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে শেখ হাসিনাকে বার্তা দিয়েছে, শেখ হাসিনা এখনই পদত্যাগ করো।
সমাবেশে জাতীয় কমিটির সিনিয়র সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আজ এই মহাসমাবেশে পলোগ্রাউন্ডে যে পরিমাণ মানুষ আছে, বাইরেও সেই পরিমাণ মানুষ আছে। আওয়ামী লীগের নেতারা, আপনারা আমাদের বাঁধা দিতে চেষ্টা করেছেন, মানসিকভাবে দুর্বল করতে চেয়েছেন। কিন্তু আপনাদের চেষ্টা সার্থক হয়নি। জাতীয়বাদী দলের ওপর নির্যাতন করেছেন, নেতাকর্মীদের গুম করেছেন, মামলা দিয়েছেন, তবে আমাদের দলকে দুর্বল করতে পারেনি আওয়ামী লীগ। এতো মামলাবাদীর পরও আওয়ামী লীগ বলতে পারবে না, আমাদের কোনো কর্মী বিএনপি ছেড়ে তাদের দলে গেছে।
তিনি বলেন, কোনো সভা-সমাবেশ আওয়ামী লীগের যে নেতাকর্মীরা বাধা দিতে চেষ্টা করবে আপনারা তাদের লিষ্ট তৈরি করুন। তাদের বিচার আমরা নয় বরং জনগণ করবে। আমরা এখানে জনগণের দাবি নিয়ে এসেছি। এরপরও আপনারা বাধা দেন কোন সাহসে।
সরকারকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, এই সরকারের আমলে তাদের চুরি-লুটপাটের জন্য আজ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়তি। শুধু তাই নয়; বিদ্যুৎ-পানির দামও বাড়তি। বার বার ভোট চোর, তাদের পক্ষে গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেওয়া হবে না। শেখ হাসিনা আপনি মনে করছেন, এ দেশ থেকে পালাবেন। না আমরা পালাতে দিব না। বিএনপির ইতিহাস আছে, এ দেশ যখন গণতন্ত্র নিয়ে বিপদে পড়ে; তখনই এ দল এগিয়ে এসে দেশের গণতন্ত্র বাঁচায়। জনগণকে নিয়ে আমরা আছি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, এই চট্টলা থেকে ১৯৭১ সালে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন। বাংলাদেশ ডাকে স্বাধীন হয়নি, স্বাধীন হয়েছে যুদ্ধে। আজ দেশে গণতন্ত্র নেই। সেই গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে আমরা আজ আবারো যুদ্ধে নেমেছি।
আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। তাদের আজ আর যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। পেটের ভাতের জন্য মানুষ আজ হাহাকার করছে। ভাত দিতে পারবেন না, বিদ্যুৎ দিতে পারবেন না, ক্ষমতায় থাকবেন কেনো? শেখ হাসিনা বাংলাদেশের জনগণের প্রধানমন্ত্রী না। চোরের স্বভাব যায় না, সুযোগ পাইলে করে চুরি। তাই এ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন আমরা মানি না।
মহাসমাবেশে যোগ দিতে গতকাল রাত ও সকাল থেকে জেলা ও উপজেলা থেকে লাখ লাখ নেতাকর্মী নগরীতে এসেছে। সকাল থেকে নগরীর প্রতিটি এলাকায় মিছিল আর স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে। সমাবেশে যোগ দিতে মঙ্গলবার রাত থেকে গাড়িতে, হেঁটে বিভিন্ন জেলা-উপজেলার নেতাকর্মীরা চট্টগ্রাম মহানগরীতে জড়ো হয়।
নেতাকর্মীদের সমাবেশে আসার পথে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে গাড়ি তল্লাশি, ভাঙচুর ও হামলায় বিএনপির অন্ততপক্ষে ১০ নেতাকর্মী আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ভোর থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে ছাত্রলীগ যুবলীগের নেতা-কর্মীরা অবস্থান নিয়ে চট্টগ্রামমুখী গাড়ি তল্লাশি পাশাপাশি বেশ কয়েকটি
গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। আহতদের উপজেলার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।
এছাড়া চট্টগ্রামে বিএনপি’র সমাবেশ শুরুর আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট পুলিশ ফাঁড়ি এলাকায় গাড়ির কাগজপত্র তল্লাশি চালিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এতে করে মহাসড়কের তল্লাশি এলাকা থেকে চট্টগ্রামমুখী লেনে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। তল্লাশির কারণে এ যানজট ১০ কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায়।
Leave a Reply