২০২৩ সালের কিছু ঘটনা হয়তো সামনের দিনের পৃথিবীকে বদলে দেবে। এর মধ্যে যেমন রয়েছে যুদ্ধের মতো মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা, তেমনি রয়েছে প্রযুক্তির উন্নয়নও।
শেষ হয়ে যাচ্ছে ২০২৩। পৃথিবীর ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাবে আরেকটি বছর। তবে অন্যান্য সব বছরের মতো এর রেশ থেকে যাবে আরও অনেক দিন। যদি হিসাব করা হয়, এ বছর পৃথিবী কতটা আরও মানুষের বসবাসের উপযোগী হলো তাহলে অবশ্য হতাশ হতে হবে আমাদের। বিভিন্ন সংবাদ ও প্রতিবেদন অনুযায়ী এ বছর শুধু গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানুষের অধিকার খর্ব হয়েছে তা-ই নয়। বড় দুটি যুদ্ধও প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে বিশ্ববাসীকে।
একদিকে প্রযুক্তিগত উন্নতি হয়েছে এ বছর।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতে পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে কিনা তা নিয়ে বোধকরি সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে ২০২৩ সালে। মহাকাশেও মানুষ তার সাম্রাজ্য বিস্তার করছে। একই সঙ্গে এর বিপরীত চিত্রে আমরা দেখেছি, গোলার আঘাতে শিশু মরছে, মানুষ উন্মুল হচ্ছে, খাদ্য ও পুষ্টির অভাবে ভুগছে।
বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বড় দেশগুলোর কর্র্তৃত্ব যেমন বাড়ছে, তেমনি আরও কাবু হচ্ছে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলো। চলতি বছর বিশ্বের বাঁকবদলের বিভিন্ন ঘটনার দিকে একটু নজর বোলানো যাক।
গণতন্ত্র
চলতি ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক মন্দা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফ্রিডম হাউজ জানিয়েছিল, ২০২২ বিশ্বব্যাপী স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্র হ্রাস পাওয়ার বছর। যার ধারাবাহিকতা বজায় ছিল এ বছরও। যেমন আফ্রিকায় সামরিক হস্তক্ষেপ অব্যাহিত ছিল। জুলাই মাসে নাইজারের সামরিক বাহিনী দেশটির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতাচ্যুত করে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো অভ্যুত্থান প্রত্যাহার না করলে হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছিল। কিন্তু মালি এবং বুরকিনা ফাসোর সামরিক জান্তারা জবাবে যুদ্ধের হুমকি দেয়। আগস্টে গ্যাবনে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা গ্রহণ করে। থাইল্যান্ডের মে মাসের নির্বাচনে একটি প্রগতিশীল দল সবচেয়ে বেশি আসন জিতলেও সামরিক বাহিনীর নিঃশ্বাস তাদের ঘাড়ের ওপর রয়েছে। এ বছর অতি-ডানপন্থি দলগুলো ইউরোপ জুড়ে ভালো ফল করেছে। যা এ অঞ্চলে শতাব্দী আগের অগণতান্ত্রিক ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়। গুয়াতেমালা, পেরুর মতো দেশেও অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায় এ বছর। আসছে বছর ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ পুনরুদ্ধার করবেন বলে আশঙ্কা। সব মিলিয়ে নতুন বছর গণতন্ত্রের জন্য কতটা ভালো হবে তা নিয়ে সংশয় আছে।
যুদ্ধ
বার্তা সংস্থা এপিতে জনি গ্র্যামবেল তার এক প্রতিবেদনে বলছেন, ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ থেকে শুরু করে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ মিলিয়ে ২০২৩ সশস্ত্র সংঘাতের এক ভয়াবহ বিপদ দেখিয়ে দিয়েছে বিশ্ববাসীকে।
তিনি বলছেন, আফ্রিকা জুড়ে অভ্যুত্থান এবং সহিংসতা সেখানকার দেশগুলোর জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মিয়ানমারেও চলছে গৃহযুদ্ধ, সুদান বিপন্ন হয়ে পড়েছে একই কারণে।
এ বছরের শেষে শুরু হয় ইসরায়েল এবং হামাসের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। গত অক্টোবর সশস্ত্র হামাস যোদ্ধারা গাজা উপত্যকার সমুদ্র তীরবর্তী ছিটমহলের চারপাশের সীমানা প্রাচীর অতিক্রম করে ইসরায়েলে হামলা চালায়। তারা প্রায় ১২শ জনকে হত্যা করে এবং দুশর বেশি জিম্মি করে। এরপর শুরু হয় ইসরায়েলের সীমাছাড়া হামলা। যুদ্ধের কোনো নিয়ম, জাতিসংঘ মহাসচিবের আকুতি, বিশ্ববাসীর দাবির তোয়াক্কা না করে গাজা উপত্যকায় বোমাবর্ষণ করেই যাচ্ছে ইসরায়েল। তারা প্রায় ২০ হাজারের বেশি গাজাবাসীকে হত্যা করেছে এ পর্যন্ত। ফিলিস্তিন দখল করে রাখা ইসরায়েলের বাহিনী কবে থামবে তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না।
আগের বছর অর্থাৎ ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করে। যে যুদ্ধ আজও চলছে। যা কবে শেষ হবে কেউ জানে না। আন্তর্জাতিকভাবে বলা হচ্ছে, এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপে সবচেয়ে বড় শরণার্থী সংকট ঘটিয়েছে। ৮.৮ মিলিয়নেরও বেশি ইউক্রেনীয় দেশ ছেড়েছে এবং আরও লক্ষাধিক অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়। নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, প্রায় অর্ধমিলিয়ন ব্যক্তি এ যুদ্ধে নিহত ও আহত হয়েছে।
চলতি ডিসেম্বরেই নাগোরনো-কারাবাখের নিয়ন্ত্রণ নেয় আজারবাইজান। এরপর থেকে অঞ্চলটির প্রায় ৩০ হাজার জাতিগত আর্মেনীয় পালিয়ে গেছে আর্মেনিয়ায়। চলতি ডিসেম্বরে মাত্র ২৪ ঘণ্টার এক সামরিক অভিযানে আজারবাইজানের সামরিক বাহিনী অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এ সময় দুপক্ষের লড়াইয়ে অন্তত ২০০ জাতিগত আর্মেনীয় এবং আজারবাইজানের কয়েক ডজন সৈন্য নিহত হয়।
এ ছাড়া পূর্ব আফ্রিকার দেশ সুদান গৃহযুদ্ধের কারণে ভেঙে পড়েছে। এ সংঘাতের শুরু হয় ২০১৯ সালের এপ্রিলে সুদানের সামরিক বাহিনী দেশের দীর্ঘকালীন স্বৈরশাসক ওমর আল-বশিরকে উৎখাতের পর। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমারেও চলছে গৃহযুদ্ধ। অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে সেনাবাহিনী উৎখাত করলে সেখানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। দেশটি এখন বিভক্ত হওয়ার পথে। ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের যুদ্ধও চলছে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে মাদক কারবারিদের সঙ্গে পুরনো সেই যুদ্ধও চলমান আছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যকার উত্তেজনা এ বছরে কমেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক মাধ্যমের খবর জো বাইডেন এবং শি জিনপিং নভেম্বরে বালিতে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে একটি ফলপ্রসূ বৈঠক করেন। যদিও এ বছর চীনের নজরদারি বেলুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে দেখা দেওয়ায় উত্তেজনা তৈরি হয়। যদিও বেইজিং জোর দিয়ে বলেছিল, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের বেলুনটি উড়ে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে চলে যায়। যে ব্যাখ্যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাখ্যান করে। ঘটনাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আবেগকে উদ্দীপ্ত করেছিল এবং ব্লিঙ্কেনকে তার বেইজিং সফর স্থগিত করতে প্ররোচিত করেছিল। ব্লিঙ্কেন অবশেষে জুন মাসে বেইজিং ভ্রমণ করেন, যাকে যুক্তরাষ্ট্র ‘গঠনমূলক’ বলে অভিহিত করে।
বিশে^র অন্য খেলোয়াড়দের মধ্যে রাশিয়া যুদ্ধে অনেক সৈন্য হারালেও ইউক্রেনের বড় অংশ দখলে রাখতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যেও তার প্রভাব কতটা আছে তা নতুন প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষত ইসরায়েলে হামাসের হঠাৎ আক্রমণের পেছনে ইরানের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করে যুক্তরাষ্ট্র। আর ইরান-রাশিয়ার মিত্রের কথাও সবার জানা। এমন সময়ে ইসরায়েলে হামলা হয়েছে যখন কাতারের পর সৌদি আরবও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র বলয়ের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলছিল, যা হামাসের ইসরায়েলে হামলার প্রতিক্রিয়ায় শুরু হওয়া যুদ্ধে নস্যাৎ হয়ে যায়।
প্রযুক্তি
চ্যাটজিপিটির সর্বশেষ সংস্করণটি তার পূর্বসূরির তুলনায় দশগুণ বেশি উন্নত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দ্রুত এগিয়ে আসছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানুষের সৃজনশীলতা এবং সমৃদ্ধির একটি নতুন যুগের সূচনা করছে, নাকি একটি দুঃস্বপ্নের ভবিষ্যৎ তৈরি করবে এমন তর্ক চলেছে বছর জুড়ে। এর পক্ষের লোকরা বলছেন, এআই বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব গতিতে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি সাধন করছে। যেমন দ্রুত ওষুধের নকশা তৈরি, চিকিৎসার রহস্য উন্মোচন এবং অমীমাংসিত গাণিতিক সমস্যার সমাধানে সক্ষম এআই। সমালোচকরা বলছেন, এ প্রযুক্তি মানুষের যে ক্ষতির কারণ হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে, ব্যাপক বেকারত্ব তৈরি, বিদ্যমান সামাজিক বৈষম্য বাড়ানো এমনকি মানবতার বিলুপ্তিও ঘটতে পারে।
একই সঙ্গে মহাকাশ জয়ের পথে আরও এক ধাপ এগিয়েছে বিশ্ব। বর্তমানে ষোলোটি দেশ মহাকাশে যান উৎক্ষেপণে সক্ষম। এ বছর রাশিয়ার চাঁদে যাওয়ার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। যার কয়েকদিন পর ভারত চতুর্থ দেশ হিসেবে চাঁদে একটি মানুষবিহীন যান অবতরণে সক্ষম হয়। চাঁদে চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি রয়েছে। মহাকাংশ গবেষণা সংস্থা নাসা ২০২৫ সালের মধ্যে মহাকাশচারীদের চাঁদে পাঠানোর লক্ষ্য হাতে নিয়েছে। তবে মানবজাতির এ উন্নতির পেছনেও রয়েছে শঙ্কা। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছড়ে পড়ে মহাকাশেও। আবার স্পেসএক্স, ব্লু অরিজিন এবং ভার্জিন গ্যালাক্টিকের মতো বেসরকারি সংস্থাগুলোর মহাকাশে বিচরণের ভূমিকা জোরদার হয়েছে এ বছর।
প্রাকৃতিক বিপর্যয়
২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী মোট ৩৮৮টি প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটেছিল। যা তার আগের ৩০ বছরের গড় হিসাব ৩৪০-এর চেয়ে বেশি। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের এ ধারাবাহিকতা আরও তীব্র হয়েছে। যদিও ২০২৩ সালের হিসাব পুরোপুরি পেতে আরও সময় লাগবে।
তবে বিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, ইতিমধ্যেই চলতি বছরের তাপমাত্রা রেকর্ড ছাড়িয়েছে। বিশ্ব জুড়ে চরম আবহাওয়ার কারণে দাবানল থেকে খরা বা বন্যার রেকর্ড হয়েছে এ বছরে। ২০২৩ সালে দাবদাহ নানা দেশে মানুষসহ প্রাণিকুলকে ভুগিয়েছে। দাবদাহের সময় দাবানলে প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সালের শুরু ও শেষের দিকে স্মরণকালের ভয়াবহ ও বিধ্বংসী দুটি ভূমিকম্প দেখেছে বিশ্ব। গত ৬ ফেব্রুয়ারি তুরস্ক ও সিরিয়ায় এবং ৮ সেপ্টেম্বর মরক্কোয় বড় ভূমিকম্প হয়। এসব ভূমিকম্পে নিহত হয় অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ঝড়-বন্যা-জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতাও দেখা গেছে।
সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর-পূর্ব লিবিয়ায় সাড়ে ১১ হাজার নিহত ও ১০ হাজারের মতো মানুষ নিখোঁজ হয়।