
আজ শুভ মাঘী পূর্ণিমা। ২৫৬৯ বুদ্ধাব্দ। বৌদ্ধদের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। একই সঙ্গে দিবসটি বৌদ্ধদের কাছে ঐতিহাসিক। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব। এ পূর্ণিমার দিনেই বর্তমান ভারতের উত্তর প্রদেশের বৈশালীর চাপাল চৈত্যে ভিক্ষুসংঘের কাছে নিজের মহাপরিনির্বাণ দিবস ঘোষণা করেন। অর্থাৎ তিনি মাঘী পূর্ণিমা দিনে মহাপরিনির্বাণ ঘোষণা করেছিলেন, ওইদিন থেকে তিন মাস পর কুশীনগরের মল্লদের শালবনে শুভ বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে স্বীয় দেহত্যাগ করে পরিনির্বাপিত হবেন।
বৌদ্ধধর্মে অষ্টমী, অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথি পালনের প্রথা আছে। তবে পূর্ণিমা তিথি সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়। বুদ্ধের সমগ্র জীবন ঘিরে স্মরণীয় ও তাৎপর্যবহ ঘটনাবলি রয়েছে, তার মধ্যে কোনো না কোনো পূর্ণিমা তিথিকেন্দ্রিক ঘটনা। যেমন—বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে সিদ্ধার্থের জন্ম, বুদ্ধত্বলাভ ও বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ লাভের ঘটনা বলে ত্রি-স্মৃতিবিজরিত বৈশাখী পূর্ণিমার অপর নাম বুদ্ধ পূর্ণিমা হিসেবে পরিচিত। আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথি থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা তিথি পর্যন্ত বৌদ্ধভিক্ষুরা একটানা তিন মাস শীল-সমাধি-প্রজ্ঞায় অনুশীলনে বর্ষাবাস অধিষ্ঠান করেন। আশ্বিনী পূর্ণিমা তিথিতে প্রবারণা উদযাপনের মধ্য দিয়ে সেই বর্ষাব্রত অধিষ্ঠান শেষ হয়। তাই আশ্বিনী পূর্ণিমাকে প্রবারণা পূর্ণিমা নামেও পরিচিত। তারপর থেকে এক মাসব্যাপী প্রতিটি বিহারে দানোত্তম কঠিন চীবর দান শুরু হয়। ভাদ্র পূর্ণিমা তিথিতে বুদ্ধের জীবদ্দশায় এক বানর বুদ্ধকে মধুদান দিয়ে পূজা করেছিল। সেই ঘটনার সূত্র ধরে ভাদ্র পূর্ণিমাটি মধুপূর্ণিমা নামে পরিচিত। মাঘী পূর্ণিমা তিথিকেও কেন্দ্র করে বুদ্ধের জীবদ্দশায় অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বস্তুত মাঘী পূর্ণিমা দিবসটি বৌদ্ধদের কাছে খুব একটা আনন্দের দিন নয়। এটা বুদ্ধকে হারানোর একটি দিন। এক ধরনের বৌদ্ধদের শোক দিবস হিসেবে আখ্যায়িত হয়। যদিও বৌদ্ধ দর্শন মতে, বৌদ্ধ ধর্মে শোক নামক জিনিস নেই। কারণ, বুদ্ধ বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে মহাপরিনির্বাণ লাভ করলেও এর সূচনাটা হয়েছিল মাঘী পূর্ণিমার তিথিতে।
তথাগত বুদ্ধ ৪৫ বর্ষা অর্থাৎ অন্তিম বর্ষা রাজগৃহের বেণুবনে অধিষ্ঠান করেন। সে সময় তিনি বর্ষাব্রতের মধ্যে ভীষণভাবে রোগাক্রান্ত হন। পরে প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও কঠোর ধ্যানবলে রোগমুক্ত হন। যাকে ছন্দ, বীর্য, চিত্ত মীমাংসা বলা হয়। বুদ্ধ বেনুবনে বর্ষাব্রত শেষ করে দেশ পরিভ্রমণের ইচ্ছা পোষণ করেন। পরে তিনি ক্রমে বৈশালীর চাপালচৈত্যে উপস্থিত হন। তখন তার বয়স পূর্ণ হয় ৮০ বছর। সেখানে প্রধান সেবক আনন্দকে সম্বোধন করে বললেন, হে আনন্দ! এ বৈশালী অত্যন্ত মনোরম স্থান। এখানকার উদ্যান, চৈত্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর।’ ভগবান ইচ্ছা করলে ঋদ্ধিবলে কল্পকাল অবস্থান করতে পারেন। কিন্তু কাল সর্বগ্রাসী। মারদ্বারা প্রলুব্ধ প্রধান সেবক আনন্দ তথাগত বুদ্ধের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়ার পরও অনুধাবন করতে পারলেন না। বুদ্ধ আনন্দকে দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার ইঙ্গিত করে আবার বললেন, হে আনন্দ! তথাগতগণ ইচ্ছা করলে স্বকীয় ঋদ্ধিবলে কল্পকাল বর্তমান দেহে অবস্থান করতে পারেন।’ হে আনন্দ! তথাগতের চারি ঋদ্ধিপাদ ভাবিত, বহুলীকৃত রথগতি সদৃশ অনর্গল, অভ্যন্তর, বাস্তুভূমিসদৃশ, সুপ্রতিষ্ঠিত, পরিচিত ও সম্যকভাবে নিস্পাদিত হয়েছে, সে জন্য তথাগতগণ ইচ্ছা করলে কল্পকাল কিংবা কল্পের অবশিষ্ট সময় অবস্থান করতে পারেন।’ বুদ্ধ কী বোঝাতে চাইলেন আনন্দ মারের দ্বারা প্রলুব্ধ হওয়ায় তা অনুধাবন করতে পারল না। কিন্তু মার বিরামহীনভাবে বুদ্ধকে শুধু একটি কথাই বারবার বলেছেন, ‘হে সুগত, আপনি পরিনির্বাণপ্রাপ্ত হোন, আপনার পরিনির্বাণপ্রাপ্ত হওয়ার এখনই সঠিক সময়। মারের প্রার্থনায় বুদ্ধ বলে উঠলেন হে পাপিষ্ঠা দুরাচার মার তথাগত অচিরেই পরিনির্বাণপ্রাপ্ত হবেন। বুদ্ধ এ সংকল্প গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে প্রবলভাবে ভূকম্পন শুরু হয়। এর হেতু কী জানতে আনন্দ বুদ্ধের কাছে ভূকম্পনের কারণ জানতে চেয়ে বুদ্ধ আনন্দকে বললেন, ‘শোন আনন্দ, যখন তথাগত আয়ুসংস্কার পরিত্যাগ করার ঘোষণা করেন, তখন পৃথিবী রোধন ধ্বনিতে কম্পিত হয়ে থাকে। তাই আমিও আজ থেকে তিন মাস পর আগামী বৈশাখী পূর্ণিমায় পরিনির্বাণে যাব।
আনন্দ বুদ্ধ কাতরকণ্ঠে অনেক প্রার্থনা করেন। কিন্তু বুদ্ধ বললেন, হে আনন্দ! তথাগত কর্তৃক যে অবশিষ্ট আয়ুষ্কাল পরিত্যক্ত হয়েছে, তিনি তিন মাস পর দেহত্যাগ করবেন বলে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, তথাগত তা কোনোমতেই প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। এটা কিছুতেই সম্ভব নয়। বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের ঘোষণা শুনে তার শিষ্য-প্রশিষ্যরা সবাই ব্যথিত হয়ে কান্না করেন। তখন বুদ্ধ তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘অনিচ্চাবত সঙখারা, উপ্পাদাবয ধম্মিনো, উপ্পাজিত্বা- নিরুজ্জন্তি ততো উপসম সুখো।’ অর্থাৎ উৎপত্তি ও বিলয় জগতের নিয়ম। উৎপত্তি হয়ে নিরুদ্ধ হওয়া জাগতিক ধর্ম। জীবন অনিত্য, সংস্কার অনিত্য। জন্ম হলেই মৃত্যু অনিবার্য। এ বিশ্বে যে যতই শক্তি ও ক্ষমতাশালী হোক না কেন এবং যে যতই বিত্তবৈভব ও সম্পদ-ঐশ্বর্যের অধিকারী হোক না কেন, ধ্যানী-জ্ঞানী, মুনি-ঋষী-মৃত্যু সবাইকে স্পর্শ করে। সবাই মৃত্যুর অধীন। এটি জগতের চিরন্তন সত্য। সত্যটি বুদ্ধজীবনেও অনিবার্য। জগতের সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অতঃপর তথাগত বুদ্ধ আনন্দকে সঙ্গে নিয়ে মহাবনে কুঠাগার শালায় গমন করলেন। সেখানে সমবেত ভিক্ষু সংঘকে বুদ্ধ তার ভিক্ষুসংঘকে পাতিমোক্ষ (বিনয় পিটক) দেশনা করেন। যেখানে ৩৭ ধরনের বোধিপক্ষীয় ধর্ম নিহিত। সংঘের উদ্দেশে এটি বুদ্ধের অন্তিম দেশনা।
বুদ্ধ নির্দেশিত সব বাণী মানবের জন্য খুবই হিতসুখ ও মঙ্গলদায়ক। বুদ্ধ সম্যক জীবিকা নির্বাহের জন্য পাঁচটি বাণিজ্য পরিহার করে সম্যক মানে সঠিক জীবনযাপন করার উপদেশ দিয়েছেন— ক. অস্ত্র ব্যবসা খ. বিষ ব্যবসা ৩. প্রাণী ব্যবসা ৪. নেশা জাতীয় দ্রব্য ব্যবসা ৫. মাংস ব্যবসা। এসবের কারণে বর্তমান বিশ্বে আজ অশান্তি বিরাজমান। তাই সবার মধ্যে মৈত্রী-করুণা-মুদিতা-উপেক্ষা চারি ব্রহ্মবিহার সঠিকভাবে অনুধাবন-অনুকরণ অনুশীলনের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যদি যে যার ধর্ম পালনে ব্রতী হই, অবশ্যই শান্তির সুবাতাসের আগমন ঘটবে। আজকের শুভ মাঘী পূর্ণিমা তিথিতে সবাইকে জানাই মৈত্রীময় শুভেচ্ছা। জগতের সব প্রাণী সুখী হোক। অশান্ত বিশ্বে শান্তি বর্ষিত হোক।
Leave a Reply