
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর থেকে বাজারে সয়াবিন তেল, চিনি, ডালসহ বেশকিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। এরমধ্যে গত কয়েকদিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঝড়-বৃষ্টিতে নতুন করে কিছু পণ্যের সরবরাহে টান পড়েছে। সেগুলোর দামও এখন বাড়ছে। সবমিলে বাজারে গিয়ে বেশ অস্বস্তিতে পড়ছেন নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষেরা।
সীমিত আয়ের মানুষেরা বলছেন, রাজধানীর বাজারে নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতিতে তাদের নাভিশ্বাস চরমে পৌঁছেছে। শুক্রবার (৮ মে) সকালে রাজধানীর বিভিন্ন নিত্যপণ্যের বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
খিলগাঁও তালতলা মার্কেটের একজন ক্রেতা আমিনুর রহমান বলেন, বাজারে এলে মনে হয় পকেট ডাকাতি হচ্ছে। সবজির চড়া দাম শুনে যখন ডিম কিনতে গেলাম, দেখি সেখানেও আগুন। গত সপ্তাহে যে ডিম ১৩০ টাকা ডজন কিনলাম, আজ তা ১৫০ টাকা চাচ্ছে।
তিনি বলেন, আমাদের মতো সাধারণ মানুষের এখন ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ অবস্থা। চড়া দামের কারণে ভালো মাছ-মাংস, এমনকি সোনালি মুরগিও বাজারের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এখন ব্রয়লার, পাঙাশ বা ডিম ভর্তাও খেয়ে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
বিক্রেতারা জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির কারণে সবজির দাম আগে থেকেই চড়া, এর মধ্যে নতুন করে যোগ হয়েছে ডিম ও চালের বাড়তি দর। সপ্তাহের ব্যবধানে ডিমের দাম ডজনে বেড়েছে অন্তত ১৫ থেকে ২০ টাকা। চালের দামও কেজিতে বেড়েছে ১ থেকে ২ টাকা।
অন্যদিকে, ভোজ্যতেলের দাম বাড়লেও খুচরা পর্যায়ে মুনাফা কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ সংকটের নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেক দোকানে এখনো তেল মিলছে না। এছাড়া জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর চিনি ও মসুর ডালের মতো বেশ কিছু অতি প্রয়োজনীয় মুদি পণ্যের দাম বেড়েছে।
একই সঙ্গে বাজারের প্যাকেটজাত গুঁড়া মসলা, পোলাওয়ের চালসহ আরও কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে গত দু-তিন সপ্তাহে।
সকালে রাজধানীর খিলগাঁও তালতলা, সেগুনবাগিচা, কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, সপ্তাহের ব্যবধানে ১৫-২০ টাকা বেড়ে প্রতি ডজন ফার্মের মুরগির ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায়। আগে এই ডিম ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকায় মিলতো। আর গত রোজার মধ্যে ছিল ১১০ টাকা ডজন।
বাজারে আলু পেঁপে ছাড়া অন্য প্রায় সব সবজি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি প্রায় ৮০ টাকার উপরে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যখনই সবজির দাম বাড়ে, তখন নিম্নআয়ের মানুষ প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে ডিমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে বাজারে ডিমের দাম হু হু করে বাড়ছে।
আরেক প্রোটিনের উৎস ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৮৫-১৯০ টাকায় স্থিতিশীল থাকলেও সোনালি মুরগি ৩৪০-৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের বিক্রেতা আব্দুর রহিম বলেন, বৃষ্টির কারণে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সবজির সরবরাহ কমে গেছে। ফলে দামও বাড়তি। সবজির দাম বেশি হওয়ায় মানুষ এখন ডিম বেশি কিনছে। গত দুদিনে লাফিয়ে লাফিয়ে ডিমের দাম বেড়ে এখন ১৫০ টাকায় ঠেকেছে। তবে সে তুলনায় ব্রয়লার মুরগির দাম ঠিক আছে।
বাজারে চালের দামের চিত্রও উদ্বেগজনক। সারাদেশে বোরো মৌসুমের ধান কাটা শুরু হলেও বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব নেই। বরং খুচরা পর্যায়ে মাঝারি মানের চাল ৬০ থেকে ৬৮ টাকা এবং মোটা চাল ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজার বিশ্লেষণ বলছে, এক মাসের ব্যবধানে মাঝারি চালের দাম ৪ শতাংশ এবং মোটা চালের দাম বেড়েছে সাড়ে ৯ শতাংশের বেশি।
ভোজ্যতেলের বাজারেও নতুন সংকট দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বাড়িয়ে লিটার ১৯৯ টাকা নির্ধারণ করলেও খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহকারীরা তাদের লাভের অংশ কমিয়ে দিয়েছেন। লিটারপ্রতি মাত্র ২ টাকা লাভে তেল বিক্রি করতে অনীহা দেখাচ্ছেন ছোট দোকানিরা। ফলে অনেক পাড়া-মহল্লার দোকানে বোতলজাত তেলের সরবরাহ কমে গেছে।
অন্যদিকে, গত রমজানের পর থেকেই গরুর মাংসের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে। ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস মানভেদে ৭৮০ থেকে ৮৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর খাসির মাংসের জন্য ক্রেতাকে গুণতে হচ্ছে প্রতি কেজি ১১০০ থেকে ১২০০ টাকা।
মাছের বাজার এখন আরও চড়া। চাষের মাছ থেকে শুরু করে নদ-নদীর মাছ—সবকিছুর দামই সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এক কেজি ওজনের রুই বা কাতলা মাছের দাম ঠেকেছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। পাঙাশ ও তেলাপিয়ার মতো সাধারণ মাছগুলোও এখন ২২০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে মাছ কিনতে আসা গৃহিণী রেহানা পারভীন বলেন, এখন বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে শুধু ঘুরতে হয়, ব্যাগে ভরার মতো সাশ্রয়ী কিছু আর নেই। বাজারে মাছ-মাংসের দাম এতো বাড়ছে যে, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের প্রোটিনের চাহিদা মেটানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Leave a Reply