
ঈদের ছুটিতে রাজধানীর মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীদের আগ্রহের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে আলোচিত গোলাপি আভার মহিষ ‘ডনাল্ড ট্রাম্প’, যে প্রাণীটি কোরবানি থেকে বেঁচে গেছে।
কোরবানির পশু হিসেবে বিক্রি হলেও শেষ পর্যন্ত সরকারি সিদ্ধান্তে চিড়িয়াখানায় ঠাঁই পাওয়া এই ‘অ্যালবিনো’ মহিষটিকে দেখতে ঈদের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার চিড়িয়াখানায় ছিল উপচে পড়া ভিড়।
এমনকি চিড়িয়াখানার বাঘ-সিংহের আকর্ষণকেও যেন হার মানিয়েছে ‘এল-০৭’ নম্বর খাঁচায় থাকা মহিষটি।
মহিষটির মাথার চুল, গায়ের গোলাপি আভা ও মুখের গঠন মিলিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ‘সাদৃশ্যপূর্ণ’ হওয়ায় এর মালিক এই অভিনব নামকরণ করেন।
নারায়ণগঞ্জের একটি খামারে পালিত মহিষটি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেরও খবর হয়েছে।
কোরবানির পশু হিসেবে খামার থেকেই বিক্রি হয়ে গেলেও গত বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে প্রাণীটির প্রাণ রক্ষা পায়। পরবর্তীতে সরকারি সিদ্ধান্তে ওইদিন রাতেই এটির স্থান হয় জাতীয় চিড়িয়াখানায়।
ঈদের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার চিড়িয়াখানার প্রবেশপথে ছিল তীব্র যানজট ও মানুষের ভিড়। সরেজমিনে দেখা যায়, যারা চিড়িয়াখানায় এসেছেন, একবারের জন্য হলেও তারা ‘ডনাল্ড ট্রাম্প’কে দেখতে এল-০৭ খাঁচার সামনে আসছেন। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো।
মহিষটিকে ঘিরে দর্শনার্থীদের মধ্যে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া ও কৌতুক দেখা গেছে। এল-০৭ খাঁচার সামনে অনেককে মজা করে বলতে শোনা যায়, “আমরা ডনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে চলে এসেছি।”
মহিষটির খাঁচার সামনে বাবার কাঁধে চড়ে আসা শিশু রোজা বারবার চিৎকার করে বলছিল, “ডনাল্ড ট্রাম্প! ডনাল্ড ট্রাম্প!”
সুবর্ণা আক্তার তার তিন বছরের ছেলে সুলাইমানকে নিয়ে এসেছিলেন গাজীপুর থেকে, লক্ষ্য সাদা মহিষ ডনাল্ড ট্রাম্প দর্শন।
তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, “সুলাইমানের বাবা নেই, তাই আমিই নিয়ে এসেছি মহিষ দেখাতে। ভাবলাম অদ্ভুত একটা জিনিস দেখলে ওর হয়তো ভালো লাগবে।”
আরমান হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী মুন্সীগঞ্জ থেকে এসেছিলেন তার সাত বছরের ছেলে আরাফকে নিয়ে।
তিনি বলেন, “সাধারণত এইসময় চিড়িয়াখানায় আসতাম না। খবরে মহিষটার কথা শুনে ছেলে জেদ করলো দেখতে যাবে। তাই চলে এলাম।”
সাখাওয়াত হোসেন নামের আরেক দর্শনার্থী বলেন, “সাধারণত ছেলে বাঘ-সিংহ দেখতে চায়। কিন্তু এবার এসে মহিষের খাঁচার সামনে থেকে নড়তেই চাচ্ছে না।”
উত্তরা থেকে স্ত্রী-সন্তানসহ ঘুরতে আসা নাহিদুল ইসলাম বলেন, “যেহেতু মহিষটির নাম দেওয়া হয়েছে বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তির নামে, এখানে হয়তো তার সম্মানের বিষয় জড়িত। কোরবানি করলে আবার শিরোনাম হতো- কোরবানি হলো ডনাল্ড ট্রাম্প। সেজন্যই হয়তো এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
সবান্ধব ‘ডনাল্ড ট্রাম্প’কে দেখতে এসেছিলেন খাইরুল কবির।
তিনি বলেন, “অ্যালবিনো জাতের মহিষ এবার প্রথম বাজারে ওঠেনি বাংলাদেশে। প্রতিবছরই কম-বেশি বিভিন্ন খামারে ও বাজারে দেখা যায়। কিন্তু এই মহিষটার আসলেই কী বিশেষত্ব তা দেখতে এলাম।”
খাইরুল কবিরের সঙ্গে থাকা রেহনুমা রায়না বলেন, “আমার চোখে আলাদা কোনো বিশেষত্ব ধরা পড়েনি। আসলেই কোনো বিশেষত্ব আছে কিনা সেটা প্রশাসন কিংবা প্রাণিবিদরা বলতে পারবেন। কারণ ছাড়া নিশ্চয়ই চিড়িয়াখানায় এনে মহিষটিকে রাখা হয়নি।”
নারায়ণগঞ্জের জিয়া উদ্দিনের খামারে লালন-পালন করা এই মহিষটি কোরবানির ঈদ সামনে রেখে কিনেছিলেন কেরানীগঞ্জের জিনজিরার মনিরুজ্জামান। খামার থেকে লালগালিচা বিছিয়ে ও রঙিন ধোঁয়া উড়িয়ে মহিষটিকে বিদায়ও জানানো হয়েছিল। তবে মহিষটি ঘিরে ব্যাপক জনসমাগম ও বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদের হস্তক্ষেপে ক্রেতাকে অর্থ ফেরত দিয়ে সেটি চিড়িয়াখানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
জাতীয় চিড়িয়াখানায় অ্যালবিনো মহিষ সংরক্ষণে নেওয়া বিশেষ উদ্যোগের বিষয়ে বৃহস্পতিবার সরকারের অবস্থান তুলে ধরেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।
নিজের ফেইসবুকে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, “প্রাণিসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের ইতিহাসে এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা হিসেবে যুক্ত হয়েছে। বিরল অ্যালবিনো প্রজাতির একটি মহিষ ইতোমধ্যে চিড়িয়াখানায় সংরক্ষণের জন্য আনা হয়েছে।
“বিশেষজ্ঞদের মতে মহিষটির শরীরে মেলানিন নামক রঞ্জক পদার্থের ঘাটতির কারণে গোলাপি বা সাদা বর্ণের বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। বিশ্বব্যাপী এ ধরনের প্রাণী অত্যন্ত বিরল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি ১০ হাজার মহিষের মধ্যে মাত্র একটি এ ধরনের বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্ম নেয়। ফলে এটি শুধু বিরল প্রাণীই নয়, গবেষণা, সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
“প্রাণীটির নিরাপদ সংরক্ষণ ও সঠিক পরিচর্যার জন্য চিড়িয়াখানায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর জন্য বড় শেড প্রস্তুত করা হয়েছে এবং সার্বক্ষণিক চিকিৎসা ও পরিচর্যা নিশ্চিত করতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
মহিষটিকে চিড়িয়াখানায় নেওয়ার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকেও জানানো হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “তিনি বিরল প্রাণী সংরক্ষণ উদ্যোগকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বারোপ করেছেন।”
এদিকে মিরপুর চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, মহিষটির গায়ের রং মূলত সাদা হলেও গায়ে রোদ পড়লে লালচে বা গোলাপি দেখায়। চিড়িয়াখানায় আনার পর প্রাণীটির জন্য আলাদা কোনো বিশেষ খাদ্যতালিকা করা হয়নি। এটির জন্য আরামদায়ক ও বিজ্ঞানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে।
মহিষটির আবাসনের জন্য প্রায় ৪০ ফুট প্রস্থ ও ৩০০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি গাছপালা ঘেরা বিশেষ শেড বরাদ্দ করা হয়েছে, যাতে প্রাণীটি প্রাকৃতিক ও ঠান্ডা পরিবেশে থাকতে পারে।
সাধারণ মহিষের মতোই এর স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা হয়েছে। প্রতিদিন খেতে দেওয়া হচ্ছে খৈল, ছোলা ও সয়াবিনের পাশাপাশি ২০ থেকে ২৫ কেজি কাঁচা ঘাস। এছাড়া মহিষটি দৈনিক প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লিটার পানি পান করে।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে চিড়িয়াখানার কিউরেটর আতিকুর রহমান বলেন, “মহিষটি বেশি গরম সহ্য করতে পারে না। সে কারণে পর্যাপ্ত পানি, ঝরনা ব্যবস্থা, গোসলের সুযোগ এবং প্রয়োজনে পাখার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এটিকে গরম থেকে পরিত্রাণ দেওয়াটাই আমাদের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ। অন্য কোনো সমস্যা নেই।”
তবে দেশে আগেও অ্যালবিনো মহিষ থাকার পরও শুধু এটিকেই কেন বিশেষ ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করা হলো এমন প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি কিউরেটর। তিনি বলেন, “আমাদের কাছে এটি সাদা মহিষ হিসেবেই এসেছে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন খামারে, বিশেষ করে সাভার, উত্তরাঞ্চল ও উপকূলীয় অঞ্চলে গোলাপি বা সাদা মহিষ নতুন কিছু নয়। ২০২৩ সালেও গাজীপুরের শ্রীপুরের একটি খামারেও এমন মহিষ আলোচনায় এসেছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফিরোজ জামান গণমাধ্যমকে বলেন, “অ্যালবিনো কোনো আলাদা প্রজাতি নয়; এটি মূলত জিনগত বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ। মানুষের মতোই গরু, মহিষ, ছাগল কিংবা শিয়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যেও অ্যালবিনো বৈশিষ্ট্য দেখা যেতে পারে।
“প্রত্যেক বৈশিষ্ট্যের জন্য নির্দিষ্ট জিন দায়ী থাকে। কোনো বংশধরের মধ্যে অ্যালবিনো জিন থাকলে এবং সেটি প্রকাশ পেলে ওই প্রাণীর শরীরে অ্যালবিনো বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। অনেক সময় পূর্বপুরুষের মাধ্যমে জিনটি বহন হলেও তা সব প্রজন্মে প্রকাশ পায় না।”
অধ্যাপক ফিরোজ জামান স্পষ্ট করেন, এটি জীবাণুজনিত বা সংক্রামক কোনো রোগ নয়। অ্যালবিনো গরু বা মহিষের মাংস খেলে মানুষের স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি হওয়ার সুযোগ নেই।
Leave a Reply