
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তিন দিনের সফরে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছেন। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ওয়াশিংটনের কাছে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে নামার পর তাকে স্বাগত জানাতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প। খবর এপি’র।
শি বিমান থেকে নামার পর ট্রাম্প ও মেলানিয়া তার সঙ্গে করমর্দন করেন। শির সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী পেং লিয়ুয়ান। শিকে স্বাগত জানাতে বিমানঘাঁটিতে ছিল বড় আয়োজন। বিমানের সিঁড়ির নিচে প্রায় ৩০ মিটার লম্বা লাল গালিচা বিছানো হয়। এর দুই পাশে দাঁড় করানো হয় ২১ সদস্যের সামরিক সম্মান গার্ড।
এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বি-১ বোমারু বিমান আকাশে উড়ে যায়। পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন শাখার সদস্যরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। দুই দেশের পতাকা প্রদর্শন এবং জাতীয় সংগীতও পরিবেশন করা হয়।
তাপমাত্রা প্রায় ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলেও ট্রাম্প গ্লাভস ও ওভারকোট পরে ছিলেন। শির সঙ্গে হাত মেলানোর সময় একটি গ্লাভস খুলে ফেলেন তিনি। একপর্যায়ে শির পিঠে হাত চাপড়ে তার সঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প। তবে তাদের কথোপকথন শোনা যায়নি। পরে হোয়াইট হাউসে ফিরে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, তিনি মনে করেন চীনের মানুষ এই অভ্যর্থনাকে মূল্য দেবে।
একই দিনে বাণিজ্যবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা
শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরের মধ্যেই দুই দেশের বাণিজ্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান বাণিজ্যবিরতির মেয়াদ আগামী ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
এই সমঝোতার আওতায় দুই দেশ শুল্ক কমানোর পাশাপাশি নতুন করে কোনো বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা না দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল।
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেসেন্ট বলেন, বর্তমান চুক্তিই বহাল থাকবে কি না, নাকি আরও বড় কোনো চুক্তি হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে বাণিজ্যবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ফলে দুই দেশের নেতাদের আলোচনার জন্য আরও সময় পাওয়া যাবে।
আগামী নভেম্বরে চীনে এবং ডিসেম্বরে ফ্লোরিডায় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ট্রাম্প ও শির দেখা হওয়ার কথা রয়েছে। এসব বৈঠকেও দুই দেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
বাণিজ্য ছাড়াও আছে আরও বড় কয়েকটি ইস্যু
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিরোধগুলোর একটি হলো বাণিজ্য। তবে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। এর মধ্যে আছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের যুদ্ধ এবং তাইওয়ান নিয়ে চীনের অবস্থান। তবে শির তিন দিনের সফরে এসব বড় বিষয় নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি আনুষ্ঠানিকতা ও জাঁকজমকও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
শির জন্য এত আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন
শি জিনপিংকে ট্রাম্পের দেওয়া বিশেষ অভ্যর্থনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রিপাবলিকান নেতার মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। সিনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার ট্রাম্পের এই জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনার সমালোচনা করেছেন। গত মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সিনেটে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, শি জিনপিং এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে চীনা প্রেসিডেন্টকে আমন্ত্রণ জানানো উচিত হয়নি বলে তিনি মনে করেন।
তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ থাকা জরুরি। কারণ দুই দেশ বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই অর্থনীতি এবং সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তির মধ্যে রয়েছে।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ড্যানি রাসেল অবশ্য এই আয়োজনকে চীনের জন্য প্রচারণাগত সুবিধা হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট চীনের নেতাকে এত সম্মান দেখানোয় বেইজিং দেশে ও বিদেশে শি জিনপিংয়ের গুরুত্ব তুলে ধরতে পারবে।
বাণিজ্যবিরতি আরও দীর্ঘ করতে চেয়েছিল চীন
চীন বাণিজ্যবিরতির মেয়াদ আরও দীর্ঘ সময় বাড়াতে চেয়েছিল। এর আগের মেয়াদ ১০ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আগামী ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সাবেক মার্কিন বাণিজ্য আলোচক ওয়েন্ডি কাটলার বলেন, এত অল্প সময়ের জন্য মেয়াদ বাড়ানোর অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখনো চীনের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন নিয়ে নিশ্চিত নয়।
বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রপ্তানি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য কেনার বিষয়ে চীন কী করে, তা দেখতে চায় ওয়াশিংটন। ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের গবেষক ক্রেগ সিঙ্গেলটন বলেন, এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র দেখতে পারবে চীন তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা পালন করছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি চীন পূরণ করে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হবে।
বৃহস্পতিবার মূল বৈঠকে বসবেন ট্রাম্প ও শি
বুধবার ছিল শিকে স্বাগত জানানোর দিন। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুই নেতা মূল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। হোয়াইট হাউসে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার পর ট্রাম্প ও শি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের পরিদর্শন করবেন। পরে একটি বিশেষ নৈশভোজে অংশ নেবেন তারা। এই নৈশভোজে প্রযুক্তি খাতের বড় ব্যক্তিরাও থাকবেন। তাদের মধ্যে এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং এবং স্পেসএক্সের ইলন মাস্ক থাকার কথা রয়েছে।
শিকে বিশেষ সম্মান দিতে চেয়েছিলেন ট্রাম্প
শি জিনপিংকে বিশেষ সম্মান দেওয়ার বিষয়টি ট্রাম্প আগেই জানিয়েছিলেন। সম্প্রতি তিনি বলেছিলেন, শির সফরের সময় তার নতুন হেলিকপ্টার অবতরণের মাঠ প্রস্তুত থাকবে। তবে হোয়াইট হাউসের বড় বলরুম তখনও প্রস্তুত না হওয়ায় তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন। চলতি বছরের শুরুতে চীন সফরে গিয়ে ট্রাম্পও জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন। বেইজিংয়ে ট্রাম্পের বিমান অবতরণের পর সেখানে লাল গালিচা বিছানো হয়।
চীনের সামরিক বাহিনীর সদস্য, সামরিক ব্যান্ড এবং প্রায় ৩০০ তরুণ-তরুণী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাদের হাতে ছিল চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা। তারা ট্রাম্পকে স্বাগত জানিয়ে স্লোগান দেন। তবে ট্রাম্পের চীন সফরের সময় শি নিজে বিমানবন্দরে ছিলেন না। তার পরিবর্তে চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেং ট্রাম্পকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
মেলানিয়া ট্রাম্প বুধবার বলেন, শি যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে আসছেন এবং ট্রাম্পের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক রয়েছে। তাই তাকে সর্বোচ্চ সম্মানের সঙ্গে স্বাগত জানানো প্রয়োজন।
ওয়াশিংটনে শিকে স্বাগত জানাতে যে দীর্ঘ লাল গালিচা ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি গত বছর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে স্বাগত জানানোর সময় ব্যবহৃত লাল গালিচার কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে।
শুক্রবার শি জিনপিং ও তার স্ত্রী পেং লিয়ুয়ান আবার হোয়াইট হাউসে যাবেন। সেখানে ট্রাম্প দম্পতির সঙ্গে ব্যক্তিগত চা-চক্রে অংশ নেবেন তারা।
এরপর তারা ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল আর্কাইভস পরিদর্শন করবেন। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কের ইতিহাস তুলে ধরে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি তাদের দেখানো হবে বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস।
Leave a Reply