
নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফিরছে না ক্রেতাদের। বিশেষ করে সয়াবিন তেল ও চিনির সরবরাহ সংকটের কারণে নির্ধারিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের (এমআরপি) চেয়ে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে এসব পণ্য। ডিমের দামও রয়েছে বাড়তি।
এর মধ্যে নতুন করে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। সব মিলিয়ে নিত্যপণ্যের বাজারে এসে বাড়তি খরচের চাপে পড়ছেন ক্রেতারা।
গত দুই-তিন সপ্তাহের তুলনায় সয়াবিন তেল, চিনি ও ডিমের দামে উল্লেখযোগ্য কোনো স্বস্তি আসেনি। বাজারে কোথাও বোতলজাত সয়াবিন তেল ও প্যাকেটজাত চিনি পাওয়া যাচ্ছে না। আবার যেসব দোকানে পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর দামও নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি। কোথাও প্যাকেট কেটে খোলা চিনি বিক্রি করা হচ্ছে বাড়তি দামে। অন্যদিকে ডিম, সবজি, আটা ও ময়দার দামও ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে আসেনি।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাজধানীর রামপুরা, হাজিপাড়া, মালিবাগ ও সেগুনবাগিচায় কয়েকটি খুচরা বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
বাজারে এক কেজি প্যাকেটজাত চিনির গায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য লেখা রয়েছে ১১০ টাকা। তবে খুচরা দোকানে তা বিক্রি হচ্ছে ১১৫ থেকে ১২০ টাকায়। বিক্রেতাদের ভাষ্য, পাইকারি পর্যায়ে বেশি দামে কিনতে হওয়ায় নির্ধারিত দামে বিক্রি করে খরচ পোষানো যাচ্ছে না। এ কারণে অনেক দোকানি প্যাকেটজাত চিনি বিক্রি না করে প্যাকেট খুলে খোলা চিনি হিসেবে বিক্রি করছেন।
একই পরিস্থিতি সয়াবিন তেলের বাজারেও। এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের নির্ধারিত দাম ২০৪ টাকা হলেও অনেক দোকানে তা বিক্রি হচ্ছে ২১০ টাকায়। সরবরাহ কম থাকায় কোথাও কোথাও বোতলজাত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কিছু দোকানে তেল থাকলেও তা সহজে ক্রেতাদের সামনে রাখা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাজারে এখন খোলা সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকা ও পাম তেল ২০০ টাকা লিটারে। যা সরকার নির্ধারিত বোতলজাত সয়াবিন তেলের চেয়েও বেশি।
কয়েক সপ্তাহ ধরেই দাম বাড়ানোর জন্য বাজারে সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমিয়ে রেখেছে কোম্পানিগুলো- এমন অভিযোগ খুচরা বিক্রেতাদের। তবে এরমধ্যে আরেকটি ভিন্ন বিষয়ও লক্ষ্য করা গেছে। মূলত লাভের মার্জিন কম হওয়ার কারণে সয়াবিন তেল বিক্রিতে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন খুচরা ব্যবসায়ীরাও। যা বাজারে তেলের সংকট আরও প্রকট করেছে।
জানা গেছে, কোম্পানিগুলো আগে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের জন্য খুচরা বিক্রেতাদের ৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত মুনাফা দিত। কিন্তু এখন সে মুনাফা হয়েছে লিটারপ্রতি মাত্র এক টাকা।
মাহিন জেনারেল স্টোরের রাজিব হোসেন বলেন, পাঁচ লিটার তেলের দাম এখন ১ হাজার ২০ টাকা। এ তেল বিক্রি করে আমাদের লাভ হবে মাত্র পাঁচ টাকা। এতো টাকা ইনভেস্ট করে অন্য পণ্য বিক্রি করলে লাভ হবে কয়েকগুণ। এরমধ্যে কোম্পানিগুলোও ঠিকমতো তেল দেয় না, হাতে পায়ে ধরা লাগে। এজন্য তেল বিক্রি বন্ধ রেখেছি।
এমন কথা এখন অনেক বিক্রেতারই। শহীদ স্টোরের একজন বলেন, কোম্পানিগুলো খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে অরাজগতা করছে। যে কারণে আমরাও তেল রাখছি না, মূল কথা এটাই।
খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছে, এক লিটার তেল ২০৪ টাকা দাম, সেটা বিক্রি করে লাভ হয় এক টাকা। অর্থাৎ শূণ্য দশমিক ৫ শতাংশ লাভে কোন পণ্য বেচাকেনা অসম্ভব। অনেকে এ বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি।।
নিত্যপণ্যের বাজারে পেঁয়াজের দামও বেড়েছে। গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে প্রায় ৫ টাকা বেড়ে ভালো মানের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। ফলে রান্নার অন্যতম প্রয়োজনীয় এ পণ্য কিনতেও ক্রেতাদের বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে।
এদিকে, ফার্মের মুরগির ডিমের দামেও স্বস্তি নেই। বিভিন্ন বাজারে প্রতি ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায়। পাড়া-মহল্লার দোকানে চারটি ডিম কিনতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৫৫ টাকা। সে হিসাবে ডজনের দাম দাঁড়াচ্ছে ১৬৫ টাকা।
স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর জন্য ডিম তুলনামূলক সাশ্রয়ী প্রাণিজ আমিষের উৎস হলেও কয়েক সপ্তাহ ধরেই বাড়তি দামের কারণে তাঁদের খরচ বেড়েছে।
বাজারে ব্রয়লার মুরগির দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায়। তবে সবজির বাজারে এখনো স্বস্তি ফেরেনি। কয়েকটি সবজির দাম আগের তুলনায় কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা কমলেও সামগ্রিকভাবে সবজির দাম রয়েছে চড়া।
আটা ও ময়দাও বিক্রি হচ্ছে আগের মতো বাড়তি দামে। প্রতি কেজি আটার দাম ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং ময়দার দাম কোম্পানিভেদে ৭০ থেকে ৮০ টাকার উপরে গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদের, যা ২/৩ সপ্তাহ আগে কেজি প্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা কম ছিল।
ইলিশের আহরণ বন্ধ। যার ফলে সাগর-নদীতে জেলেদের বিচরণ কমেছে। ইলিশের সাথে ধরা পড়া অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের যোগানও কমেছে। আর সে কারণে খাল-বিল আর চাষের মাছের ওপর চাপ বেড়েছে।
আর আগে থেকেই তো চড়া মাছের বাজার। এর সাথে যোগান স্বল্পতার অজুহাতে এবার আরেক দফা চড়েছে মাছের বাজার।
চাষের রুই-কাতলার দাম বেড়েছে কেজিতে ৫০ টাকার বেশি। নদ-নদীর বিভিন্ন সুস্বাদু মাছের গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে সর্বোচ্চ ২শ’ টাকা পর্যন্ত বাড়তি গুণতে হবে।
বিক্রেতাদের দাবি, জ্বালানিতে তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে মাছের আহরণ খরচ বেড়েছে। এর প্রভাবে উসকে গেছে মাছের বাজার।
এদিকে, চড়া দামে অপরিবর্তিত আছে পোল্ট্রি বাজার। দেশি মুরগির দাম কিছুটা কমলেও দাম সাধারণের নাগালের বাইরে। কেজিতে গুণতে হচ্ছে ৬শ’ টাকা। তাই অল্প আয়ের মানুষের ভরসা ব্রয়লার জাতের মুরগিতে। সেখানেও এক কেজির জন্য দাম হাকা হচ্ছে ১৯০ টাকা। ৩৪০ টাকা কেজির নিচে মিলছে না সোনালি জাতের মুরগি। এর জন্য পোল্ট্রি ফিডের দাম বৃদ্ধিকেই দুষছেন বিক্রেতারা।
৭৮০ থেকে ৮শ’ টাকা কেজিতে অপরিবর্তিত আছে গরুর মাংসের দাম। তবে কেজিতে ১০০ টাকা কমে খাসির মাংস মিলছে ১২শ’ টাকায়।
দামের উত্তাপ কমছে না ডিমের দোকানগুলোতেও। গত সপ্তাহের মতো চড়াভাব বিরাজ করছে। রাজধানীর বড় বাজারগুলোতে এক ডজন লাল ডিম কিনতে দিতে হবে ১৫০ টাকা। আর সাদা ডিম মিলছে ১৪০ টাকায়। যদিও পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে আরও বাড়তি ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি গুণতে হচ্ছে।
এছাড়া, শীতকালীন সবজি বাজারে উঠতে শুরু করেছে ঠিকই, কিন্তু দাম কমার কোনো নাম নেই। উল্টো ফুলকপি, করলার মতো অনেক সবজিরই দাম কিছুটা বেড়েছে। শিম, টমেটো, ধনে পাতার দর শুনলে পিলে চমকে উঠার জোগাড়। লেবুও বিকোচ্ছে বাড়তি দামে।
বিক্রেতারা বলছেন, মৌসুমের আগাম চালান কেবল আসতে শুরু করেছে। জোগান বাড়লে দাম নিয়ন্ত্রণে আসবে। অথচ উৎপাদন খরচ বাড়ায় বাড়তি দরের লাভ পৌঁছাচ্ছে না কৃষকের কাছে।
Leave a Reply