বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের সরকারি জাপান সফর দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানাইয়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে আয়োজিত এই সফরে আজ দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও মধ্যাহ্নভোজ অনুষ্ঠিত হবে। এই সফরের মধ্য দিয়ে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষিপ্রযুক্তি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বিমান চলাচলের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
এবারের সফরে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় ঢাকার মেট্রোরেলের নির্মাণ খরচ ও ঋণের সুদের হার পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে। এর পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাপানের সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হবে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর সফরকালে ‘জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরাম’-এ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন, যেখানে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের অমিত সম্ভাবনা তুলে ধরা হবে। শীর্ষস্থানীয় জাপানি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি তিনি চিবার এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, পারমাণবিক সদর দপ্তর এবং নাগোয়ায় টয়োটা মোটরসের কারখানা পরিদর্শন করবেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য এই সফর এক বিরল আবেগ ও সৌভাগ্যের বিষয়। এর আগে তাঁর পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মাতা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সূর্যোদয়ের দেশ জাপান সফর করে দুই দেশের সম্পর্কের শক্ত ভিত্তি রচনা করেছিলেন।
জাপানের সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গভীর। ১৯০১ সালে ‘এক এশিয়া’ নীতিতে বিশ্বাসী জাপানি দার্শনিক তেনশিন ওকাকুরা (ওকাকুরা কাকুজো) উপমহাদেশ সফরে এসে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সান্নিধ্যে আসেন। দুই দেশের জাতীয় পতাকার সাদৃশ্য-সাদা বা সবুজ জমিনের বুকে উদীয়মান লাল বৃত্ত-এই আত্মিক সম্পর্কেরই যেন এক নীরব প্রতীক।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির বাধ্যবাধকতার কারণে জাপান সরকার প্রকাশ্যে সমর্থন দিতে না পারলেও, সে দেশের রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। স্বাধীনতা লাভের পরপরই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনে জাপান উদারভাবে এগিয়ে আসে। জাপানি সংস্থা জাইকার অর্থায়নে নির্মিত যমুনা বহুমুখী সেতু উত্তরাঞ্চলের মঙ্গা দূর করে দেশের অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে।
দুই জাতির এই গভীর মমত্ববোধের নেপথ্যে রয়েছেন কুষ্টিয়ায় জন্ম নেওয়া বাঙালি বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ‘টোকিও ট্রায়ালে’ মিত্রশক্তির প্রবল চাপ উপেক্ষা করে তিনি নিজস্ব প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তায় জাপানি জাতি ও তাদের সম্রাটকে যুদ্ধাপরাধের সর্বগ্রাসী দায় থেকে রক্ষা করেছিলেন। জাপানের পাঠ্যপুস্তকে ও স্মৃতিস্তম্ভে আজও এই বাঙালি বিচারপতির নাম গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হয়।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের এই চ্যালেঞ্জিং সন্ধিক্ষণে প্রধানমন্ত্রীর এই জাপান সফর অত্যন্ত সময়োপযোগী। প্রযুক্তি হস্তান্তর, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সফর বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও সুদৃঢ় করবে বলে আশা করা হচ্ছে। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন
Leave a Reply